একটুকু বলা
অধ্যায় ১: প্রথম দিন
২০০৮ সাল। নবম শ্রেণিতে নতুন এক বছর শুরু। ক্লাসের জানালা দিয়ে আলো এসে পড়ছে বেঞ্চের ওপর। হঠাৎ করেই মিস বললেন, "একজন নতুন ছাত্রী এসেছে আমাদের ক্লাসে। তার নাম তিতলি।"
তিতলি ধীরে ধীরে ক্লাসে ঢুকল। তার চোখে একটা চঞ্চলতা, ঠোঁটে হালকা হাসি। অর্ণব একপাশে বসে ছিল, সে থমকে গেল। কে এই মেয়ে? এমন চাহনি সে আগে কোনোদিন দেখেনি।
"তুই নতুন?" অর্ণব আস্তে করে জিজ্ঞাসা করল।
তিতলি মাথা নেড়ে হাসল। সে তখনও জানত না, এই হাসিটাই অর্ণবের জীবনের প্রতিদিনের চাওয়া হয়ে যাবে।
অধ্যায় ২: ধীরে ধীরে....
দিন যেতে লাগল। অর্ণব বুঝল, সে শুধু তাকিয়ে থাকতে পারে। বলার সাহস পায় না। অথচ তিতলি যেন সহজভাবে মিশে যায় সকলের সঙ্গে। সে হাসে, গল্প করে, আবার দুষ্টুমি করে অর্ণবকে 'গম্ভীর বাবু' বলে ডাকে।
ক্লাসের পড়া মাঝে মাঝে গুলিয়ে যায় অর্ণবের। কারণ সে ব্যস্ত থাকে তিতলির খাতায়, তার হাতের লেখায়, আর চুলের ফিতেতে।
একদিন লাইব্রেরিতে বই নিতে গিয়ে দুজনের হাত একসঙ্গে একটা কবিতার বই ছুঁয়ে ফেলে। দুজনেই চমকে ওঠে। তিতলি মৃদু হেসে বলল, "তুই নাকি কবিতা পড়িস?"
অর্ণব বলল, 'না... মানে, পড়ি না। তবে তুই ধরেছিলি তো, তাই... হয়তো পড়ে ফেলব।"
তিতলির চোখে একটা অদ্ভুত ঝিলিক দেখা গেল।
অধ্যায় বোঝা যায়, বলা যায় না
পুজোর দুটির আগে স্কুলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। তিতলি গান গায়, অর্ণব আবৃত্তি করে। মঞ্চে ওঠার আগে তিতলি বলল, "তুই পারবি, আমি জানি।'
অর্ণবের হাত কাঁপছিল, গলা শুকিয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু তিতলির বলা 'তুই পারবি' যেন জাদুর মতো
কাজ করল।
সেই দিন, প্রথমবার, অর্ণব ভেবেছিল আজ বলে দেবে-সে ভালোবাসে। কিন্তু বলতে পারেনি। শুধু দূর থেকে তাকিয়ে দেখেছে, তিতলি কত হাসছে বন্ধুদের সঙ্গে।
অধ্যায় ৪. চিঠি....
স্কুলে শেষ বর্ষ। সবাই ব্যস্ত পরীক্ষা আর ভবিষ্যৎ নিয়ে। কিন্তু অর্ণব ব্যস্ত একটা চিঠি লিখতে-তিতলিকে। একটা ছোট্ট চিঠি, ভরা ভালোবাসা আর না-পারা কথায়।
'তিতলি,
আমি জানি, তোকে বলা হয়ে ওঠেনি। জানতিস না, আমার সকাল শুরু হত তোর হাসি দিয়ে। ক্লাসে ঢুকলেই খুঁজি তোকে। জানিনা কখন, কিভাবে তোকে ভালোবেসে ফেলেছি। কিন্তু ভয় করত-তুই যদি না বুঝিস? যদি হারিয়ে ফেলি তোকে?"
কিন্তু সেই চিঠি কখনও দেওয়া হয়নি। খামের ভাঁজে তিতলির নাম লেখা রইল, ঠিক তার নিজের স্কুল ডায়েরির শেষ পাতায়।
অধ্যায় ৫ দেখা নয়, বিচ্ছেদ
মাধ্যমিক পরীক্ষার পরে তিতলি চলে গেল অন্য শহরে, পড়াশোনার জন্য। বলেও গেল না কিছু। শুধু ফেয়ারওয়েল-এর দিন সবাইকে জড়িয়ে ধরছিল, অর্ণবের দিকে তাকিয়ে একটু থেমে গেল, চোখে জল ছিল যেন। কিন্তু সে কিছু বলেনি।
অর্ণব শুধু ভাবল-এই তাহলে শেষ? না বলা ভালোবাসার যবনিকা?
অধ্যায় ৬. আবার...
২০১২। কলেজের প্রথম দিন। অর্ণব ভর্তি হয়েছে ইংরেজিতে অনার্স। নতুন বন্ধু, নতুন ক্লাসরুম। কিন্তু পুরনো অভ্যাস যায় না-পেছনের বেঞ্চে বসে জানালা দিয়ে তাকিয়ে থাকা।
সেই দিন লাইব্রেরির সিঁড়িতে আচমকা মুখোমুখি-তিতলি!
দুজনে চমকে গেল। যেন সময় থেমে গেল কিছুক্ষণের জন্য। তিতলি আগে বলল, "তুই? অর্ণব?" অর্ণব যেন বিশ্বাস করতে পারছিল না। শুধু বলল, "তুই ফিরলি?"
তিতলি হেসে বলল, 'এই শহরে ফিরেছি, এই কলেজেই ভর্তি হয়েছি।"
অধ্যায় ৭: বলা...
কলেজ ফেস্টের আগের দিন। সন্ধ্যায় ক্যাম্পাসে বসে আছে দুজন। অর্ণব আর পারছিল না চেপে রাখতে। সে বলল,
"আমি তোকে ভালোবাসতাম, স্কুল থেকেই। তখন বলা হয়নি, ভয় পেতাম।"
তিতলি চুপ করে ছিল কিছুক্ষণ। তারপর ব্যাগ থেকে একটা চিঠি বের করল। সেই চিঠি-অর্ণবের লেখা।
"আমি এটা পেয়েছিলাম। অনেক দেরিতে। কিন্তু রেখে দিয়েছিলাম। আমি তোকে ভালোবাসতাম, অর্ণব।'
অধ্যায় ৮: আমরা...
তারপর গল্পটা সহজ নয়। প্রেমের মানে শুধু হাতে হাত ধরা নয়, একসাথে কাঁদা, ঝপড়া, ভুল বোঝা আর আবার কাছে আসা। অর্ণব আর তিতলি সবটা পেরিয়ে একে অপরকে শক্ত করে ধরেছে।
অধ্যায় ৯: নতুন বন্ধুত্ব, পুরনো হৃদয়
তারা প্রতিদিন দেখা করে, গল্প করে, পুরনো দিন মনে করে হাসে। কিন্তু এখন তাদের চারপাশে। নতুন মানুষ, নতুন জগত।
অর্ণবের বন্ধু অরিজিৎ বলত, 'তুই আর তিতলি, তোদের মধ্যে কিছু একটা আছে, বুঝি আমি।"
অর্ণব শুধু মুচকি হাসত। হৃদয়টা বলত, "আছে তবে এখন সেটা বোঝানো নয়, বোঝার সময়।'
অধ্যায় ১০: প্রথম ছোঁয়া
এক সন্ধ্যায় কলেজ থেকে ফেরার পথে হঠাৎ ঝড় উঠল। তিতলির ওড়না উড়ে গেল, আর অর্ণব ধরে ফেলল। সেই মুহূর্তে চোখে চোখ, হৃদয়ে হালকা কম্পন।
তিতলি ধীরে বলল, 'তোকে ভালো লাগত স্কুলে, এখনো লাগে। কিন্তু তখন বলার সাহস পাইনি।"
অর্ণব দাঁড়িয়ে ছিল ছায়ার নিচে। বলল, "এইবার সাহস পেয়েছিস?"
তিতলি হেসে বলল, "হয়তো, ধীরে ধীরে।"
অধ্যায় ১১: প্রেমের পরীক্ষা
প্রেম মানে শুধুই সুখ নয়, মাঝেমাঝে কিছু ভুল বোঝাবুঝি, অবিশ্বাস আর রাগ জমে যায়। তিতলি অর্ণবকে নিয়ে বন্ধুদের মাঝে কিছু ব্যক্তিগত কথা বলে ফেলেছিল। অর্ণব মর্মাহত হয়েছিল।
দু'দিন তারা কথা বলেনি। কিন্তু তারপর তিতলি এসে বলল,
"ভুল করেছি আমি, কিন্তু তুই তো জানিস-আমি তোকে ভালোবাসি, হাসি-মজার মধ্যেও তুই আমার বুকের ভিতর।"
অর্ণব কেঁদে ফেলেছিল সেই রাতে। সেই প্রথমবার কেউ তাকে নিজের ভুল মেনে ভালোবাসা দিয়ে জয় করেছিল।
অধ্যায় ১২: মা-বাবার চোখে
তাদের সম্পর্ক আর শুধু বন্ধুত্বের মধ্যেই আটকে ছিল না। একদিন তিতলির মা বললেন, "তুই যার সঙ্গে এত কথা বলিস, সে কি তোর বন্ধু না কিছু বেশি?"
তিতলি মাথা নিচু করে বলেছিল, 'ভালোবাসি ওকে মা।"
অর্ণবের বাড়িতেও একই প্রশ্ন। সে চোখে চোখ রেখে বলেছিল, 'ওর জন্য লড়তে পারি।"
বড়রা প্রথমে অবাক হলেও ধীরে ধীরে বুঝেছিল-ভালোবাসা যদি এতটা স্পষ্ট হয়, তাকে আটকে রাখা যায় না।
অধ্যায় ১৩: দূরত্বের দিন
তিতলি এক বছর পড়াশোনার জন্য বাইরে চলে গেল-অন্য শহরে। ফোনে, মেসেজে, ভিডিও কলে কথা হতো ঠিকই, কিন্তু মাঝে মাঝে মন খারাপ হতো অর্ণবের।
সে লিখে ফেলল একটা কবিতা:
"একটা চিঠি তোকে পাঠাই না, কিন্তু প্রতিদিন লিখি, কিছু শব্দ তোর নামের পাশে বসিয়ে রেখে যাই। তুই পড়িস না ঠিকই, তবু জানি-হাওয়া তোকে জানায়।"
তিতলি পড়ে কেঁদেছিল। সে ফিরেই বলেছিল, "এই দূরত্বও আমাদের জিততে শেখাবে।"
অধ্যায় ১৪: ফিরে আসা, নতুন স্বপ্ন
তিতলি ফিরল। এবার শুধু প্রেম নয়, ভবিষ্যতের স্বপ্ন নিয়ে। তারা একসাথে কাজ শুরু করল-ছোটদের পড়ানোর জন্য একটা সোশ্যাল প্রজেক্ট। ভালোবাসা এবার বাস্তবতার মুখোমুখি।
অর্ণব বলল, 'ভালোবাসি মানেই হাত ধরা নয়, পাশে থাকা। তুই যেখানে যাবি, আমি সেখানেই থাকব-পাশে, ছায়ার মতো।"
তিতলি হেসে বলল, "তুই শুধু ছায়া নয়, আমার আলো।"
অধ্যায় ১৫: জীবন মানে আমরা
কলেজ শেষ। সবাই ব্যস্ত চাকরি, পড়াশোনা, ভবিষ্যতের পরিকল্পনায়। অর্ণব চাকরি পেয়েছে। তিতলি ভর্তি হয়েছে মাস্টার্সে।
সন্ধ্যায় তারা সেই পুরনো কলেজ চত্বরে বসে। অর্ণব বলল,
"তুই জানিস, প্রথম যেদিন তোকে দেখেছিলাম, ভাবিনি এই গল্প লিখব।"
তিতলি চোখ ভিজিয়ে বলল, "এই গল্প লিখেছি দু'জনে মিলে। ভালোবাসা একা লেখা যায় না।"
অধ্যায় ১৬: চিরন্তন একসাথে
ছাদনাতলা, সিঁদুর, মালা বদল এসবের মধ্য দিয়ে একদিন সত্যিই শুরু হল তিতলি আর অর্ণবের সংসার। ছোট্ট একটা ভাড়া ফ্ল্যাটে, দুইজনেই হাতে হাতে ঘর সাজাল। পুরনো কলেজের নোটবুক থেকে কেটে কেটে তারা একসাথে সাজাল দেওয়ালের কোলাজ-তাদের ভালোবাসার গল্পের স্মৃতি।
রান্না করা শিখল অর্ণব, আর তিতলি শিখল বিল পেমেন্ট কিভাবে করতে হয়। জীবনের নতুন অধ্যায় যেন একটা অনভ্যাস কিন্তু মধুর তাল-দু'জন একে অপরের ছায়া হয়ে উঠল।
অধ্যায় ১৭: কাজের চাপ, প্রেমের অবসর
অর্ণব এখন একটা নামী বিজ্ঞাপন সংস্থায় কাজ করে। তিতলি পড়াচ্ছে স্কুলে। প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যা দৌড়ঝাঁপ। একদিন তিতলি বলে ফেলল, 'তুই আমার সঙ্গে আর গল্প করিস না।'
অর্ণব চমকে গিয়ে বলল, "আমি তো তোকে ছেড়ে যাইনি, শুধু সময় কম।'
তিতলি হাসল না। বলল, 'ভালোবাসা কখনো কম হয় না, শুধু কখনো সময় চেয়ে বসে।" সেই রাতে অর্ণব তার ল্যাপটপ বন্ধ করে, তিতলির কাঁধে মাথা রেখে বলল, "আজ থেকে
প্রতিরাতে এক কাপ চা, আর তোর গল্প শোনা আমার কাজ।"
অধ্যায় ১৮: তর্ক, অভিমান, ফিরে আসা
একদিন অর্ণব দেরি করে বাসায় ফিরল। ফোনে ব্যস্ত ছিল, তিতলি অপেক্ষায়। হালকা কথার মাঝে জমে উঠল অভিমান। দু'জনেই চুপ করে রইল বেশ কয়েক ঘণ্টা।
পরদিন সকালে দরজার পাশে একটা নোট পেল তিতলি-
"তোর অভিমান আমার কাছে সোনা। কারণ জানি, তার মানে তুই আজও আমাকে
ভালোবাসিস।"
তিতলি সেই চিঠি বুকের কাছে চেপে ধরে বলল, "ভালোবাসা মানে চুপচাপ থেকেও পাশে থাকা।"
অধ্যায় ১৯: সন্তানের স্বপ্ন
তাদের ভালোবাসা থেকে জন্ম নিল নতুন এক স্বপ্ন-একটি সন্তান। তিতলি একদিন বলল, "তুই চাইলে নাম রাখব আমাদের সেই স্কুলের দিনের কিছু থেকে।"
অর্ণব বলল, "তবে মেয়ে হলে নাম রাখব 'চিঠি'। কারণ তোকে কখনো যে চিঠিটা দিইনি, সেই না বলা ভালোবাসা আজ নতুন জীবনে আসবে।"
তিতলির চোখ ভিজে উঠল। বলল, "তোর ভালোবাসা এমন, যা বলে না, বোঝায়।'
অধ্যায় ২০: অভিভাবকতা, অপেক্ষা ও ক্লান্তি
সম্ভান আসার পর জীবন পুরো বদলে গেল। রাতের ঘুম, অফিসের দায়িত্ব, শিশুর কান্না-সব মিলিয়ে তারা যেন নতুন এক পরীক্ষায়। কিন্তু অর্ণব তিতলির পাশে থেকেছে, আর তিতলি শিখেছে ভালোবাসার সবচেয়ে বড় রূপ-ত্যাগ।
তিতলি বলত, "ভালোবাসা মানে শুধু গোলাপ ফুল নয়, বরং রাত জাগা, দুধ গরম করা, আর একসাথে ক্লান্ত মুখে হাসা।"
অধ্যায় ২১: নতুন সকাল
চিঠি বড় হচ্ছে। সে এখন স্কুলে যায়। অর্ণব তাকে পড়ায় কবিতা, তিতলি তাকে শেখায় ছবি আঁকা। আর প্রতিদিন রাতে ঘুমের আগে তারা সবাই একসাথে বসে গল্প করে।
চিঠি জিজ্ঞ্যেস করে, "তোমরা কীভাবে প্রেমে পড়লে?"
তিতলি হেসে বলে, "তোর বাবা প্রথমে কিছুই বলত না।"
অর্ণব মুচকি হেসে বলে, "তোর মা-ই প্রথম বলেছিল-'ধীরে ধীরে সাহস পাচ্ছি।"
অধ্যায় ২২: পুরনো স্কুলে ফেরা
একদিন তারা সবাই মিলে গেল সেই পুরনো স্কুলে। অর্ণব আর তিতলি দাঁড়িয়ে ছিল সেই বেঞ্চের পাশে, যেখানে প্রথম দেখা হয়েছিল।
তিতলি বলল, 'এই জায়গাটা আজও সেই রকম আছে, কিন্তু আমরা বদলেছি। তবে একটুকু বলা আজও থেকে গেছে মনে।"
অর্ণব বলল, "তুই সেই দিনের মতোই আছিস আমার চোখে।"
চিঠি দৌড়ে বেড়াচ্ছে চারপাশে। নতুন একটা ভালোবাসার গল্প তৈরি হচ্ছে-নতুন প্রজন্মে।
অধ্যায় ২৩: স্বপ্নের সিঁড়ি
তারা দু'জনে মিলে একটি ছোট বই প্রকাশ করল-'একটুকু বলা'। তাতে ছিল সেই না বলা চিঠি, কবিতা, আর স্মৃতির ফোটোগ্রাফ।
বইমেলায় দাঁড়িয়ে এক তরুণী এসে বলল, "এই গল্পটা পড়ে আমি কেঁদেছিলাম, আবার হাসতেও
পেরেছিলাম।"
তিতলি বলল, "ভালোবাসার গল্প যদি কাউকে ছুঁয়ে যেতে পারে, তবে সে প্রেম চিরন্তন।"
অধ্যায় ২৪। না বলা শেষ লাইন
বৃষ্টি পড়ছে জানালার কাচে। অর্ণব চুপ করে বসে লিখছে। তিতলি এসে বলে, 'কি লিখছিস?"
অর্ণব বলল, 'গঞ্জের শেষ লাইন।"
তিতলি জিজ্ঞেস করল, "শেষটা কেমন?"
অর্ণব মুচকি হেসে বলল, "শেষ বলব না... লিখছি-'তারা আজও একসাথে বসে, একটুকু বলা দিয়ে প্রতিদিন নতুন গল্প শুরু করে।"
অধ্যায় ২৫: ধীরে ধীরে বার্ধক্য
চিঠি এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। অর্ণব ও তিতলি চাকরি থেকে অবসর নিয়েছে। ঘরে এখন সকাল শুরু হয় পাখির ডাক আর এক কাপ লাল চা দিয়ে। বারান্দায় বসে দু'জনে প্রতিদিন সূর্যোদয় দেখে।
তিতলি বলল, "বুড়ো হয়েছি রে, চুল সব সাদা হয়ে গেল।"
অর্ণব হেসে বলল, "তোর চুলে এখনো ফিতে বাঁধতে পারি, যেমন স্কুলে বাঁধতিস।'
তারা বুড়ো হয়েছে, কিন্তু ভালোবাসাটা এখনো কিশোর-একটুকু বলা-র মতোই সতেজ।
অধ্যায় ২৬: পুরনো চিঠির বাক্স
একদিন তিতলি পুরনো কাঠের বাক্সাটা খুলে বসে। তাতে পুরনো স্কুল ডায়েরি, কলেজের কবিতা, বিয়ের কার্ড আর সেই চিঠিটা-যেটা অর্ণব তাকে কখনো দিতে পারেনি।
চিঠির পাশে ছোট্ট করে লেখা ছিল-'যদি হারিয়ে ফেলি তোকে, তবুও এই পাতায় রয়ে যাস।" তিতলির চোখে জল এসে গেল। অর্ণব এসে পাশে বসে বলল, "তুই হারাসনি, বরং এখনো আমার ভেতর থাকিস, যেমন ছিলি ক্লাসে প্রথম দিন।"
অধ্যায় ২৭: স্মৃতির ভ্রমণ
তারা একসাথে বেড়াতে যায় সেই স্কুলটায়, কলেজটায়, যেখানে প্রেম শুরু হয়েছিল। বেঞ্চে বসে তারা হাত ধরে বসে থাকে।
একদল নতুন ছেলে-মেয়ে পাশ দিয়ে যাচ্ছে, হাসছে, ছবি তুলছে। তিতলি মৃদু হাসে।
"তাদের দেখলে নিজেদেরই মনে পড়ে" বলে অর্ণব।
"হ্যা" উত্তর দেয় তিতলি, "আমরা ওদের মতোই ছিলাম, শুধু মোবাইল ছিল না... ছিল চোখ, আর না বলা ভাষা।"
অধ্যায় ২৮: চিঠির কবিতা
চিঠি এখন কবিতা লেখে। তার কবিতার বইয়ের নাম-"বলার আগেই ভালোবাসা'। উৎসর্গে লেখা-'মা ও বাবাকে, যাদের প্রেম আমাকে শেখাল ভালোবাসা মানে কখনো চিৎকার নয়, নিঃশব্দে পাশে থাকা।"
তিতলি কেঁদে ফেলে বইটা পড়ে। অর্ণব বলে, "তোর সেই ফিতেটা নিয়ে একদিন গল্প শুরু হয়েছিল, এবার আমাদের মেয়ে লিখছে আমাদের ভাষায়।"
অধ্যায় ২৯: একটি মৃত্যু
তিতলির শরীর খারাপ হতে থাকে। ডাক্তার বলে, শরীর দুর্বল, বয়স হয়েছে। একদিন বিকেলে সে জানালার ধারে বসে, অর্ণবের হাত ধরে থাকে।
তিতলি বলে, "আমি যদি না থাকি, তুই কি লিখবি আমার কথা?'
অর্ণব কিছু বলে না। শুধু বলে, 'তুই আছিস, থাকবি। যতদিন আমি লিখতে পারি, তুই ততদিন বেঁচে থাকবি আমার শব্দে।"
সেই রাতেই তিতলি চিরঘুমে চলে যায় নীরব, শান্ত, ভালোবাসার একটুকু বলে।
অধ্যায় ৩০ : নিঃসঙ্গ সকাল
অর্ণবের দিনগুলো আর আগের মতো নয়। বারান্দা ফাঁকা, চায়ের কাপ একটাই, গল্পের শ্রোতা নেই।
কিন্তু প্রতিদিন সে লেখে। ডায়েরির পাতায়, নতুন কবিতায়, চিঠিকে চুপচাপ শেখায় সেই গল্পগুলো যা তিতলিকে বলা হয়নি।
তিতলির ছবির নিচে সে লিখে রেখেছে, 'তুই আছিস, আমি লিখছি... একটুকু বলা আজও বাকি।"
অধ্যায় ৩১ : স্মৃতিচারণা
চিঠি একদিন এসে বলে, "বাবা, আমি একটা ডকুমেন্টারি বানাতে চাই-তোমাদের প্রেম নিয়ে। স্কুল থেকে বৃদ্ধ বয়স অবধি, এই পথচলা যেন সবাই জানে।"
অর্ণব শুধু বলে, "তোর মা হাসবে, জানি। কারণ ও বলত, আমাদের গল্প সিনেমার চেয়েও বেশি সিনেমা।"
চিঠি হেসে বলে, "তোমাদের প্রেম আমি নিজের চোখে দেখেছি-তুমি যেভাবে মা-কে দেখতে, সেটা কেউ শেখাতে পারে না।"
অধ্যায় ৩২: অর্ণবের শেষ চিঠি
বয়সের ভারে অর্ণবও একদিন ক্লান্ত হয়ে পড়ে। লিখে যায় শেষ চিঠিটা, সেই চিরকালের প্রিয় কাগজে-তিতলির নামে।
"তিতলি, আজও তুই আছিস। বাতাসে, চিঠির চোখে, আমার প্রতিটি কবিতায়। আমি তোর জন্যই বেঁচে ছিলাম, এখন লিখে যাব তোর কথা।
তোর অর্ণব।"
অধ্যায় ৩৩: শেষ দেখা
চিঠি বাবার লেখা চিঠিটা পড়ে। তার চোখে জল, হাতে মা-বাবার পুরনো ফটো। সে বলে, "তোমরা একসাথে আছো, একটুকু বলার মধ্যেই তোমরা চিরন্তন।"
অধ্যায় ৩৪: প্রেমের উত্তরাধিকার
আজও সেই স্কুলে একটা ছোট কর্নার আছে, যার নাম রাখা হয়েছে-"একটুকু বলা"। সেখানে রাখা আছে অর্ণবের কবিতা, তিতলির চিঠি, আর তাদের ছবির কোলাজ।
ছাত্রছাত্রীরা পড়ে, হাসে, কাঁদে। কেউ কেউ ভালোবাসার মানে বোঝে।
আর এক কোণায় লেখা থাকে:
"ভালোবাসা কখনো শেষ হয় না, সে শুধু রূপ বদলায়। যারা একটুকু বলেছিল, তারা আজও গল্প হয়ে বেঁচে আছে।"
সমাপ্ত❤️🩹