মৃণ্ময়ী
প্রকৃতি তার সবথেকে প্রিয় সন্তানদের মনে হয় তার মতই সহনশীলতা দিয়ে পাঠায়। কখনো কখনো কিছু কিছু ক্ষেত্রে এই সহনশীলতা এর মাত্রা যখন অতিক্রম হয়ে যায়, সে তখন আবার তার সেই সন্তানকে নিজের কাছে ফিরিয়ে নেয় !
মৃণ্ময়ীর জন্ম এক মধ্যবিত্ত পরিবারের ছোট শহরে। বাবা ছিলেন স্কুলশিক্ষক, মা ঊষা শান্ত স্বভাবের গৃহবধূ, কিন্তু সংসারে কষ্ট ,দৈন্যতা , দারিদ্রতা ছিল নিত্যসঙ্গী।
মৃণ্ময়ী ছোটবেলা থেকেই একটু চুপচাপ , শান্ত স্বভাবের মেয়ে।
ওর সমবয়সী বাকি বাচ্চারা যখন মাঠে খেলত, সে বসে থাকত নদীর ধারে — গাছের ছায়ায়, একদৃষ্টে আকাশ এর দিকে তাকিয়ে।
তার চেহারা ছিল সাধারণ, চোখ দুটো বড়, কালো , যেন রাতের অন্ধকার নেমে এসেছে কিন্তু মুখে কেমন এক মলিন হাসি লেগেই থাকত।
পাড়ার লোক বলত,
“মেয়েটা শান্ত, কিন্তু মুখখানা তো তেমন কিছু সুন্দর নয়। এই মেয়ের বিয়ে দিতে পারো কিনা দেখো! তবে দেখে তো মনে হয় পাত্র পেতে ভালোই কষ্ট হবে।”
সে কথা ছোটবেলার মৃণ্ময়ী বুঝত না, কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কেমন যেন ছায়ার মতো জমে গেল ভিতরে , তার চোখের কালো আধার যেন তার মনে সঞ্চিত হতে থাকলো ক্রমশ।
কিছুদিনের জ্বর এ ভুগে হঠাৎ তার বাবা মারা গেলেন! বাবার মৃত্যুর পর সংসারের ভার নামল মায়ের কাঁধে। মা একা বয়স্ক গৃহবধূ! তাই প্রতিবেশীরা মৃণ্ময়ীর বিয়ের পরামর্শ দিতে লাগলো! বিয়ের প্রস্তাবও এলো!
বিয়ের প্রস্তাব এল উন্মেষ চৌধুরী নামের এক প্রাপ্ত বয়স্ক যুবকের — সরকারি চাকরি, ভদ্র পরিবার, শহরের লোক। মৃণ্ময়ীর থেকে বয়সে বেশ বড়!
মা একটু দ্বিধা করলেও, সমাজের চাপে রাজি হলেন।
বিয়ের দিন মৃণ্ময়ীকে মা লাল শাড়ি পড়িয়ে দিলেন ,কিন্তু চোখে কোনো উজ্জ্বলতা ছিল না! — শুধু মা এর মনের কষ্টটা মৃণ্ময়ী বুঝতে পারছিল!
উন্মেষের বড়ো বাড়ি , প্রচুর অর্থ, কিন্তু ভেতরে ভালোবাসার অভাব। হয়তো মৃণ্ময়ী তা বুঝতে পেরেছিল !
সেই বাড়ির কেন্দ্রবিন্দু উন্মেষ এর মা নিবেদিতা চৌধুরী — কঠোর, অহংকারী , সমাজ-সচেতন নারী।
প্রথম দিন থেকেই মৃণ্ময়ীর প্রতি তাঁর ঠান্ডা অবজ্ঞা স্পষ্ট।
“এই মেয়ের মুখে তো কিছুই নেই, উজ্জ্বলতা কোথায়? এমন হবে জানলে বিয়ে দিতাম নাকি?এ আমার উন্মেষকে মানায় না।”
মৃণ্ময়ী চুপ করে শোনে।
স্ত্রী হিসেবে তার কাজ — সব সহ্য করা মুখে হাসি নিয়ে, ঘর সামলানো। যেন মানুষ হিসাবে তার কদর নেই! ঘরের মানুষ তাকে যেন মানুষ হিসেবে দেখে না, দেখে এক দায়িত্ব, এক উপস্থিতি মাত্র।
উন্মেষ ছিল ভদ্র, কিন্তু অদ্ভুতভাবে দূরত্ব বজায় রেখে চলতো।
সে নিজের মা এর কথার বাইরে কখনো যায়নি।
যখন মা কিছু বলত, সে নীরবে মাথা নাড়ত — মৃণ্ময়ীর চোখের দিকে তাকাতও না।
যেন মৃণ্ময়ী তার স্ত্রী নয়, একটা দায়িত্ব!
রাতের নীরবতায় সে যখন জানালার ধারে বসে থাকত, দূর থেকে শোনা যেত ঘড়ির টিকটিক শব্দ — যেন সময়ও তার প্রতি নির্লিপ্ত।
আসলে মানুষ ভালোবাসার ভিক্ষুক! আর সে যখন তা পায় না তখন এক তীব্র যন্ত্রণা তাকে আবৃত করে। আর সব করেও যখন সেই ভালোবাসা পায়না তখন তার আর কিছুই চাইবার থাকে না! সে তখন চাই হারিয়ে যেতে! যেখানে গেলে সে পেতে পারে একটু ভালোবাসা!
দিন কেটে যায়।
মৃণ্ময়ীর জীবন এক অনবরত পুনরাবৃত্তি — সকাল থেকে রাত পর্যন্ত একই কাজ, একই কথা, একই তাচ্ছিল্য।
তবু সে ভেতরে ভেতরে চেষ্টা করে ভালো থাকতে।
সে গাছ লাগায়, ফুলের টবে জল দেয়, পুরোনো ডায়েরিতে কিছু লেখা শুরু করে।
একদিন লিখেছিল—
“শান্তি মানে হয়তো সব পেয়ে যাওয়া নয়, কিন্তু আমি কি অন্তত একটু ভালোবাসা পাবার যোগ্য নই?”
উন্মেষ কোনোদিন সেই ডায়েরি পড়েনি। হয়তো সে দেখেছে তাকে লিখতে, মৃণ্ময়ীর আবদার মাখানো চোখ যেমন সে অগ্রাহ্য করেছে সবসময় তেমনই হয়তো তার লেখা পাতাগুলোকে !
তাকে সে শুধু “স্ত্রী” হিসেবে চিনত, “মৃণ্ময়ী” হিসেবে নয় অথবা কখনো চিনতেও চায়নি!
একদিন বৃষ্টি পড়ছে টানা।
বাড়ির ছাদ থেকে জল ঝরছে, উঠোন ভিজে গেছে।
মৃণ্ময়ী রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল।
হঠাৎ শাশুড়ি এসে বলল—
“এই মেয়ে, তোমাকে কে বলেছে আমার ছেলে বিয়ে করতে? তোমার তো রূপও নেই দেখার মত। বিদায় হলে বাঁচি।”
বলে চলে গেলেন।
মৃণ্ময়ী বুঝল শাশুড়ি কোনো কারণে রেগে গেছেন আর সেই রাগেরই প্রকাশ করলেন তার উপর! কিন্তু সে জানে তার এই রাগে কিছু মনে করলে হবে না! কারণ শাশুড়ি এর কথামত বাপের বাড়ি চলে গেলে মা সামলাতে পারবে না! তাই তাকে এখানেই থাকতে হবে। তাই সে নীরবে শুধু তাকিয়ে রইল বাইরে — আকাশে ধূসর মেঘ, মাটিতে কাদা, গাছের পাতায় জল।
তার মনে হলো, সে যেন সেই পাতার মতো —
যার উপর বারবার বৃষ্টি পড়ে, কিন্তু কেউ তাকিয়ে দেখে না।
রাতে উন্মেষ ১৫ দিন বাড়ির বাইরে কাজ থেকে ফিরে এল।
মৃণ্ময়ী কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল।
উন্মেষ জিজ্ঞেস করল না, “তুমি কেমন আছো?”
বরং হালকা ক্লান্ত গলায় বলল—
“মা-র কথায় মন দিও না।”
তারপর নিজের ঘরে চলে গেল।
এই এক বাক্যই যেন মৃণ্ময়ীর জীবনের সারাংশ।
পরদিন সকাল।
সবাই ঘুমোচ্ছে, মৃণ্ময়ী ঘরের ভেতর নিঃশব্দে বসে আছে।
তার হাতে একটা চিঠি, চোখে জল নেই, শুধু এক অদ্ভুত স্থিরতা।
চিঠিটায় সে লিখেছে—
“আমি কাউকে দোষ দিচ্ছি না। শুধু একটু ভালোবাসা, একটু মানুষ হিসেবে দেখা—এইটুকুই চেয়েছিলাম।
আমি ক্লান্ত। হয়তো আমার নিজের একটা বাড়ি থাকলে মন খারাপ হলে তাতে চলে যেতে পারতাম! তাই হয়তো সেই বাড়ির খোঁজেই চললাম আমি! যেখানে আছে সম্মান ও একটু ভালোবাসা! তাই আমি সেই বাড়ির খোঁজে চললাম এক নতুন যাত্রায়!
তোমরা সবাই ভালো থেকো।”
সে দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে গেল।
আকাশে ভোরের আলো উঠছে, নদীর দিকে কুয়াশা ভাসছে।
পাখিরা উড়ছে দূরে — মৃণ্ময়ীও যেন তাদের অনুসরণ করল।
বিকেলে গ্রামের কিছু ছেলে দেখে, নদীর ধারে একটা শাড়ি ভাসছে।
চেনা রং, চেনা গন্ধ।
আর একটু দূরে জলে ভেসে আছে মৃণ্ময়ীর নিথর দেহ — শান্ত, নিরব, সুন্দর।
দিন যায়।
উন্মেষ কিছুদিন নীরব থাকে।
শাশুড়ি প্রথমে ভয় পায় যদি কেউ কিছু বলে, কিন্তু কেউ তেমন কিছু বললো না দেখে তিনি রটিয়ে দিলেন , “হয়তো মেয়েটার মন ঠিক ছিল না।”
তারপর কিছুদিনের মধ্যেই সব আগের মতোই হয়ে যায়।
দুই মাস পর উন্মেষ আবার বিয়ে করে।
এইবার মেয়েটি সুন্দরী, প্রাণবন্ত, সমাজে মানানসই।
বাড়িতে আলো, হাসি, অতিথি, সংগীত।
কেউ “মৃণ্ময়ী” নামটি উচ্চারণ করে না।
শুধু মাঝে মাঝে, বৃষ্টির রাতে,
উন্মেষ হঠাৎ চমকে জেগে ওঠে—
জানালার পাশে যেন কেউ দাঁড়িয়ে আছে।
মুখ দেখা যায় না, কিন্তু চোখ দুটো চেনা লাগে।
সে চোখ যেন নিঃশব্দে বলে—
“তুমি আমায় ভুলে গেলে, কিন্তু তোমার বিবেক কি পারবে?”
উন্মেষ তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ, তারপর আলো নিভিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। তার মনটা কিরকম যেন করে, যা সে বোঝাতে পারে না! এটাই কি ভালোবাসা? সে কি ভালোবেসেছিল মৃণ্ময়ীকে? এর উত্তর সে জানে না! জানলেও এখন তার আর কিছুই করার নেই!
সময় চলে যায়।
নতুন স্ত্রী হৈমন্তী, নতুন সংসার,উন্মেষের প্রমোশন সব নিয়ে ব্যস্ত সবাই।
সবকিছু ঠিকঠাক, সুন্দর।
শুধু ঘরের এক কোণে একটা পুরোনো ডায়েরি পড়ে থাকে, যা কেউ কখনো খুলেই দেখেনি—
ধুলো জমে গেছে তাতে।
ভেতরের পাতায় লেখা আছে শেষ লাইনটি —
“আমি ছিলাম, কেউ দেখেনি। না, এক মুহূর্তের জন্যও না! না আমি ভালোবাসা পাইনি! শুধু একটু ভালবাসার ভিক্ষুক হয়েই রয়ে গেলাম। হয়তো তার দাম এতই যে এক মুহূর্তের জন্যও পেলাম না!”
--------------------------- সমাপ্ত ----------------------------
“ হয়তো কখনও কখনও সবচেয়ে শান্ত মৃত্যুই পৃথিবীর সবচেয়ে করুণ প্রতিবাদ। হয়তো সবাই সব কিছুই পেলো, শুধু মাঝখান থেকে হারিয়ে গেলো সেই মেয়েটি, মৃণ্ময়ী।”
♡♡♡♡♡♡♡♡♡♡♡♡♡♡♡♡♡♡♡♡♡♡♡♡♡♡
© All rights reserved. Do not copy or redistribute without permission.
(IF YOU LIKE MY STORY , MAKE SURE YOU FOLLOW ME FOR MORE INTERESTING PARTS! PLEASE TAP THE LIKE BUTTON IF YOU LIKE THE STORY! AND DON’T FORGET TO EXPRESS YOUR THOUGHTS IN THE COMMENT BOX! MAKE SURE TO GIVE A REVIEW SO I CAN DO BETTER! ♡)
[THE ENGLISH VERSION IS ON NEXT CHAPTER]