সেই প্রথম ভালোবাসা

All Rights Reserved ©

Summary

Sickness has taken hold of me. Writing this story laying in the bed. life has been weird lately. I Don't know where life is taking me. By the way its my story. The things I have experience. My pain my story. My first love. My love story. Story by his pagli.

Genre
Romance
Author
Nobera
Status
Ongoing
Chapters
1
Rating
n/a
Age Rating
18+

Chapter 1

বাড়ির সিঁড়িঘরটা দিনের বেলাতেও বেশ অন্ধকার থাকে, কিন্তু তাহিয়ার কাছে এটাই সবচেয়ে প্রিয় জায়গা। যখন বাইরের জগতের কোলাহল তার আর সহ্য হয় না। তখন সে নিঃশব্দে এসে বসে থাকে সিঁড়ির জানালার ধারের শেষ ধাপটিতে। জানালার শিকগুলো যেন তার জীবনের ছোট ছোট সীমাবদ্ধতা। যার ওপাশে দেখা যায় বিশাল আকাশ আর হরেক রকমের বড় বড় দালান।

আজও সে ওখানেই বসে ছিল। ঘড়ির কাঁটায় তখন সন্ধ্যা নেমেছে। জানালার ওপাশে বিশাল একটা চাঁদ উঠছে। কিন্তু তাহিয়ার মন পড়ে আছে তার ফোনের স্ক্রিনে। স্ক্রিনের নীল আলোয় তার গোলাপি হিজাব পরা মুখটা দেখাচ্ছে কোনো এক বিষণ্ণ ছবির মতো। তার কানে একটা গানের লাইন বাজছে- "jab koi pyar se bulayega, tumko ek shaks yaad ayega"।

একটি ভারি দীর্ঘশ্বাস নিল। সিঁড়ির এই নির্জনতায় বসে সে যেন শুনতে পায় ফেলে আসা দিনগুলোর প্রতিধ্বনি। শৈশবের সেই চঞ্চল তাহিয়া সে যখন হাসতো, সেই হাসিতে ভোরের নরম রোদের মতো এক বিশুদ্ধ আভা ছড়িয়ে পড়ত, যা চারপাশকে মুহূর্তেই উজ্জ্বল করে তুলতো। সে আজ এই সিঁড়িঘরের অন্ধকারে স্মৃতি হাতড়ে বেড়ানো এক নিঃসঙ্গ মেয়ে।

সে জানে, জানালার ওপাশের চাঁদটা সবার জন্য সমান জোছনা ছড়ায়, কিন্তু তার অন্ধকার সিঁড়িঘরের এই ছোট জানালাটুকু দিয়ে যতটুকু আলো আসে, সেটুকুই তার সম্বল।

তাহিয়া এখন এক অদৃশ্য দেয়াল তুলে নিয়েছে নিজের চারপাশে। সিঁড়িঘরের এই অন্ধকার কোণে যখন সে একা বসে থাকে, জানালার ওপাশে তাকিয়ে কাউকে ভীষণভাবে মনে করে, তখন কেউ বুঝতে পারে না তার মনের ভেতরে কী ঝড় চলছে, সে কি ভাবছে। সে এখন হাসতে শিখে গিয়েছে, সবার সাথে আবার আগের মত কথা বলতে শিখেছে, কিন্তু সেই হাসির গভীরে যে কত বড় এক নীরব হাহাকার লুকিয়ে আছে, তা এখন আর কেউ জানে না।

এখন আর সে কাউকে তার কষ্টের কথা বলে না। সে বুঝে গেছে, কিছু কষ্ট একান্তই নিজের, যা কাউকে বোঝালে কেবল দুশ্চিন্তাই বাড়ে, কিন্তু সমাধান মেলে না। তার কষ্ট গুল কেবল তার কাছে বোঝা না। বরং তার পরিবারের জন্যেও। বাড়ির লোক ভাবতেও পারে না— তাদের আদরের সেই চঞ্চল মেয়েটি টিউশনিতে যওয়ার আগে এখানে বসে থাকে। তারা জানে না তাদের আদরের মেয়েটি কত গভীর এক নিঃসঙ্গতাকে তার বন্ধু বানিয়ে নিয়েছে।

সময় হয়েছে যাওয়ার, আর বেশিক্ষন হারিয়ে যাওয়া মানুষের শোক করলে হবে না। সে উঠে দারালো। ব্যাগ টা হাতে নিল। সিড়ি দিয়ে নামতে শুরু করল।

রাস্তাটা খুব পরিচিত। শৈশবে এই পথ দিয়েই সে বাবার হাত ধরে হাঁটত। আশে পাশে বিভিন্ন পরিচিত দোকান পরিচিত মানুষ। দোকান গুলর আলয় তার দীর্ঘ ছায়াটা একা একাই তার সাথে হাঁটছে। তার মনে হলো, এখন সে এই রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে কাঁদে। কিন্তু করল না। কারণ সে এখন নিজের বিষণ্ণতাকে আড়াল করতে বড্ড বেশি পারদর্শী হয়ে গেছে। হাঁটতে হাঁটতে সে সেই এক পরিচিত কাঠের দরজার সামনে এসে দাঁড়াল। এই দরজার কড়া নাড়লেই দুইজোড়া উৎসুক চোখ তাকে স্বাগত জানায়। রাহা এবং রাহিয়ান। তার কাছে পড়ে।

রাহা আর রাহিয়ান ছোট্ট দুই ভাইবোন। তাদের আরেকটা ছোট ভাই আছে রাফি।

দরজার কড়া নাড়ার শব্দ শেষ হতে না হতেই ভেতর থেকে চটপটে পায়ের আওয়াজ পাওয়া গেল। দরজাটা খুলতেই ভেসে এল একরাশ নির্মল হাসি। রাহা আর রাহিয়ান। তাদের চোখেমুখে এক অদ্ভুত উদ্দীপনা, যেন তাহিয়া মিসের আসার জন্য তারা দীর্ঘক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছিল।

তারা দুজনেই তাহিয়াকে সালাম জানাল। রাহা তার ছোট হাত দিয়ে তাহিয়ার হিজাবটা টেনে ধরে বলল, "আজকে কিন্তু আমাদের একসাথে রঙ করার কথা মিস।"

তাহিয়া হাসল। অনেকক্ষণ পর তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে অকৃত্রিম হাসি ফুটে উঠল। বাইরের ওই বিষণ্ণ রাস্তা, সিঁড়ির অন্ধকারের জানালা, আর মনের ভেতরে জমে থাকা কষ্টের দলা—সব যেন এক নিমেষে ম্লান হয়ে গেল এই দুইজোড়া উজ্জ্বল চোখের সামনে। এরা তার কাছে পড়তে বসে ঠিকই, কিন্তু দিনশেষে ওরাই যেন তাহিয়াকে আবার হাসতে শিখায়। সে বুঝতে পারে, সে যখন ওদের পড়ায়, তখন সে আসলে নিজের একাকীত্বকেও ভুলিয়ে রাখে। তার ভেতরে যে বিশাল হাহাকার কেউ দেখতে পায় না, রাহা আর রাহিয়ানের এই নিঃস্বার্থ ভালোবাসা সেখানে প্রলেপ লাগিয়ে দেয়। সে এখন আর শুধু তাদের 'শিক্ষিকা' নয়, বরং এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোতে সে নিজেই এক আশ্রিত কিশোরী হয়ে ওঠে।

পড়ার টেবিলে বসতেই রাহা আর রাহিয়ানের চিরচেনা দুষ্টুমি শুরু হয়ে গেল। রাহিয়ান গণিত বইয়ের আড়ালে লুকিয়ে তাহিয়ার দিকে তাকিয়ে হাসছে, আর রাহা কলম দিয়ে খাতার কোণায় ফুল আঁকতে ব্যস্ত। তাহিয়া গম্ভীর হওয়ার ভান করে বলল, "রাহিয়ান, কালকের পড়াটা কি বাসায় আবার দেখেছ? আমি কিন্তু আজ আবার পড়া নিব" রাহিয়ান মুখ টিপে হেসে বলল, "হ্যা মিস পড়েতোছিলাম কিন্তু আর কেবল একবার একটু দেখে নেই?"

এই খুনসুটির মাঝেই দরজায় মৃদু টোকা পড়ল। রাহা-রাহিয়ানের মা প্রতিবারের মতো নিয়ম করে ট্রে হাতে ঘরে ঢুকলেন। ট্রে-তে সুন্দর করে সাজানো গরম ধোঁয়া ওঠা নাস্তা— আর তার ঠিক মাঝখানে তাহিয়ার সবচেয়ে প্রিয় দুধ চা।

তাহিয়া চায়ের কাপে প্রথম চুমুকটা দিল। এই চায়ের স্বাদটা তার কাছে শুধু স্বাদ নয়, এক ধরণের সান্ত্বনা। সিঁড়িঘরের সেই ঠান্ডা একাকীত্বের পর এই উষ্ণ কাপটি যেন তাকে মনে করিয়ে দেয় যে পৃথিবীতে এখনো যত্ন আর মমতার অস্তিত্ব আছে।

রাহিয়ান আর রাহা দুজনেই মুহূর্তেই সোজা হয়ে বসল। শুরু হলো পড়ার নতুন উদ্যম। তাহিয়া দেখল, জানালার ওপাশে রাতের অন্ধকার।

পড়ানো শেষে বাসায় ফিরল। সে হাসিমুখে সবার সাথে দু-একটা কথা বলল। বাসার মানুষগুলো অবাক হয়ে দেখল, তাদের সেই শান্ত আর চুপচাপ হয়ে যাওয়া মেয়েটি আজ নিজে থেকেই গল্পের ঝুলি খুলেছে। যদিও মনের ভেতরের সেই সূক্ষ্ম বিষণ্ণতাটুকু এখনো মরে যায়নি, তবুও সে চাইল আজকের দিনটা একটু স্বাভাবিকভাবে কাটুক।

পরিবারের সাথে কিছুটা সময় কাটিয়ে সে নিজের ঘরে ফিরে এল। হিজাবটা খুলে পড়ার টেবিলে গিয়ে বসল সে। সামনে খোলা পড়ে আছে মোটা মোটা বই আর নোটখাতা। বাইরের জগতটা তার জন্য যতই জটিল হোক না কেন, এই টেবিল আর বইগুলোর মাঝখানে সে এক অন্যরকম স্বাধীনতা খুঁজে পায়। পড়তে বসলেও মাঝেমধ্যে তার দৃষ্টি জানালার ওপাশে চলে যায়। সেই একাকীত্বের জানালা, যেখানে বসে সে আকাশের দিকে তাকিয়ে কাউকে মনে করত। কিন্তু এখন সে কলমটা শক্ত করে ধরল। তাকে এগোতে হবে। তার বিষণ্ণতা এখন আর তার দুর্বলতা নয়, বরং এক গোপন শক্তি হতে হবে।

বইয়ের শেষ পাতাটা বন্ধ করে তাহিয়া একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। রাতের খাবারটা আজ সবার সাথেই খেল সে, যদিও খুব বেশি কথা বলেনি।

হাত-মুখ ধুয়ে যখন সে নিজের বিছানায় গা এলিয়ে দিল, ঘরের বাতিটা নিভিয়ে দিতেই বাইরের অন্ধকারটা যেন চাদরের মতো তাকে জড়িয়ে ধরল।

চোখ বোজাই ছিল, কিন্তু ঘুম যেন আজ অনেক দূরের পথযাত্রী। বালিশে মাথা রাখতেই সেই অবাধ্য স্মৃতিগুলো একে একে ভিড় করতে লাগল—যেগুলো সে সারাটা দিন পড়ার বই, আব্বু, আম্মু, বোনেরা আর রাহা-রাহিয়ানের হাসির আড়ালে লুকিয়ে রেখেছিল।

তার মনে পড়ে গেল সেই সময়টার কথা, যখন সে আজকের মতো এত একা ছিল না। সেই মানুষটার সাথে কাটানো মুহূর্তগুলো, তার সেই হাসি যা একসময় তাহিয়ার প্রতিটি সকালকে রাঙিয়ে দিত। কেন আজ সেই চেনা কণ্ঠস্বরটা শুধু ফোনের পুরনো মেসেজে কিংবা রাতের নির্জনতায় দীর্ঘশ্বাস হয়ে ফিরে আসে।