Chapter 1
আমি একজন ক্যাথল্যাব টেকনোলজিস্ট।
অনেক দিনের মতো সেদিনও আমি হাসপাতালে নাইট শিফটে ডিউটিতে ছিলাম। দিনটা অস্বাভাবিক ব্যস্ত ছিল। একটার পর একটা কেস করতে করতে কখন যে গভীর রাত হয়ে গিয়েছিল, আমরা কেউ বুঝতেই পারিনি।
সবশেষে এল সেই কেস—যেটা আজও মনে পড়লে আমার গায়ের লোম খাড়া হয়ে যায়।
রোগীটি ছিল একজন যুবতী মহিলা। কয়েক বছর আগেই তার বিয়ে হয়েছে। কিন্তু ভাগ্যের নিষ্ঠুর খেলায় তার Complete Heart Block (CHB) ধরা পড়েছিল। তাই জরুরি ভিত্তিতে তার পেসমেকার বসানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
রোগীকে ক্যাথল্যাবে আনা হলো।
কিন্তু তার স্বামী আসতে পারেননি। বাড়ির অন্য একজন আত্মীয় তাকে নিয়ে এসেছিলেন।
প্রসিডিউরের আগে থেকে রোগীটি একটাই কথা বলছিল—
“আমি কি একটু আমার স্বামীর সাথে কথা বলতে পারি?”
কিন্তু তখন রাত অনেক হয়ে গেছে। ফোনে যোগাযোগও করা যাচ্ছিল না।
প্রসিডিউর শুরু হলো।
শুরুর দিকে সব ঠিকঠাক চলছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই রোগীর অবস্থা খারাপ হতে শুরু করল।
মনিটরের অ্যালার্ম বেজে উঠলো।
রোগীটা কাঁপা গলায় বারবার বলছিল—
“আমার স্বামী কোথায়… আমি ওর সাথে কথা বলতে চাই…”
আমরা সবাই রোগীকে বাঁচানোর জন্য মরিয়া হয়ে চেষ্টা করছিলাম।
কিন্তু সব চেষ্টার পরেও…
হঠাৎ সব শেষ হয়ে গেল।
রোগীটি কার্ডিয়াক ফেইলিউরে চলে গেল।
আমাদের চোখের সামনে টেবিলেই তার মৃত্যু হলো।
আমরা অনেক চেষ্টা করলাম। কিন্তু কিছুই কাজ করলো না।
পুরো OT তখন নিস্তব্ধ।
রক্তে ভেজা টেবিলের উপর পড়ে আছে একটি তাজা নিথর দেহ।
পরে নিয়ম অনুযায়ী তাকে স্টিচ করে প্রস্তুত করা হলো, কারণ অফিসিয়ালি ডেথ ডিক্লেয়ার করা হবে ICU-তে নিয়ে যাওয়ার পর।
এরপর আমার জুনিয়ররা হ্যান্ডওভারের কাজ শুরু করল।
কিছুক্ষণ পর সবাই কাজ শেষ করে বেরিয়ে গেল।
সেই সময় পুরো ক্যাথল্যাবে আমি একাই ছিলাম।
প্রায় দেড় ঘণ্টা পরে সব কাজ শেষ হলো।
আমি ক্যাথল্যাব বন্ধ করে দিলাম।
আমাদের ক্যাথল্যাব OT-এর পাশেই একটি ক্লিনিং রুম আছে। সেখানে একটু শোবার মতো জায়গা করা আছে, যেখানে মাঝে মাঝে আমরা বিশ্রাম নিই।
সেদিন এত ক্লান্ত ছিলাম যে শরীর আর চলছিল না।
একটা সবুজ শিট পেতে সেখানে শুয়ে পড়লাম।
জায়গাটা খুবই ছোট। একটু নড়াচড়া করলেই নিচে পড়ে যাওয়ার মতো অবস্থা।
চোখ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।
হঠাৎ করে একটা তীব্র আলোর ঝলকানিতে আমার ঘুম ভেঙে গেল।
চোখ খুলে যা দেখলাম—
আজও মনে পড়লে শরীর ঠান্ডা হয়ে যায়।
আমার সামনে, বাতাসে যেন ভেসে উঠেছে সেই মহিলার নগ্ন, রক্তাক্ত দেহ।
সে যেন আমার দিকে তাকিয়ে আছে।
তার চোখে অদ্ভুত এক আকুতি।
মনে হচ্ছিল সে আমাকে কিছু বলতে চাইছে।
ভয়ে আমার শরীর ঘামে ভিজে গেল।
কিন্তু আমি নড়তেও পারছিলাম না—নড়লেই নিচে পড়ে যাব।
আমি চোখ বন্ধ করে ফেললাম।
মনে মনে উপরওয়ালার নাম জপতে শুরু করলাম।
কোনোভাবে হাতড়ে ফোনটা খুঁজে পেলাম।
টর্চ অন করতে যাচ্ছি—
ঠিক তখনই পাশের ঘর থেকে আমার জুনিয়র ছুটে এল।
আর মুহূর্তের মধ্যেই সবকিছু অদৃশ্য হয়ে গেল।
সব শান্ত।
জুনিয়রটা হাঁপাতে হাঁপাতে বলল—
“দাদা… মনে হচ্ছে ওই মহিলাটা আমাকে ডাকছে… সে তার স্বামীর সাথে কথা বলতে চায়…”
আমরা দুজনেই ভয় পেয়ে গেলাম।
তারপর আমরা গিয়ে ডাক্তার লাউঞ্জে বসে পড়লাম।
নিজেদের বোঝাতে লাগলাম—
“স্ট্রেসের জন্য হয়তো ভুলভাল স্বপ্ন দেখেছি…”
ঠিক তখনই হঠাৎ করে একটা ঠান্ডা বাতাসের ঝাপটা আমাদের সামনে দিয়ে বয়ে গেল।
জানালার পর্দা উড়ে এসে সরাসরি আমার মাথার উপর পড়ল।
সেই মুহূর্তে বুঝলাম—
আমি যা দেখেছিলাম…
তা হয়তো শুধুই স্বপ্ন ছিল না।
পরের দিন আমরা খবর পেলাম—
সেই মহিলার স্বামীও মারা গেছেন।
তারপর থেকে…
আমি আর কখনো তাকে দেখিনি।
প্রশ্নটা এখনো রয়ে গেছে…
সেদিন আমি কী দেখেছিলাম?
একটা ক্লান্ত মস্তিষ্কের ভুল?
নাকি একজন স্ত্রীর শেষ ইচ্ছা, যে শুধু একবার তার স্বামীর সাথে কথা বলতে চেয়েছিল?
আপনারা বলুন…
ওটা আসলে কী ছিল? 👻