এক
অনেক বছর পর হঠাৎ করেই আজকে এমন কিছু অনুভূতির মুখোমুখি হলেন একজন বাবা, যা তাঁর আগে কখনো হয়নি। না, ঠিক তা নয়। একসময় হতো। সে অনেক আগের কথা। যখন ক্যারিয়ারের কাছে তিনি নিজের জীবনকে বিক্রি করে দেননি, সেই সময় তাঁর এমন অনুভূতি হতো। তিনি হঠাৎই উপলব্ধি করলেন, তিনি দীর্ঘদিন তাঁর ছেলের মুখ লক্ষ করে দেখেননি। শুধু তা-ই না, তিনি সর্বশেষ কবে ওর সাথে নরম স্বরে আদরের কথা, ভালোবাসার কথা বলেছেন সেটাও তিনি মনে করতে পারছেন না। তিনি ওকে উঠতে-বসতে আদেশ, নয়তো কড়া কথার উপর রাখতেন ছোটবেলায়। একটা ঘটনা তাঁর মনে পড়লো। একবার একজন বন্ধুকে বাসায় নিয়ে আসার 'অপরাধে' তিনি ওকে চড় মেরেছিলেন। একটু বড় হওয়ার পর ও তাঁর কাছ থেকে একরকম আলাদা হয়ে যায়। তিনি ওকে গত কয়েক বছরের মধ্যে অপ্রয়োজনীয় কোন কথা বলেছেন কি না, সেটাও তিনি মনে করতে পারলেন না। তিনি আবিষ্কার করলেন, মাতৃহারা ছেলেটার প্রতি যে পরিমাণ স্নেহ-ভালোবাসা দেয়া প্রয়োজন ছিল, তার কিছুই তিনি দেননি। বরং তার প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ করেছেন। এবং ওকেও পরোক্ষভাবে তাঁর মতো হৃদয়হীন হওয়ার শিক্ষা দেয়ার চেষ্টা করেছেন। যদিও সে তা গ্রহণ করেনি। আজকে তাঁর মনে হলো, তাঁর জীবন ব্যর্থ। তিনি একজন ব্যর্থ বাবা।
তিনি ভাবলেন, "এখনও কি ঠিক হওয়ার সময় আছে?" হয়তো না। তাঁর ছেলেটা কি তাঁকে ঘৃণা করে? তিনি কখনও তা জানার চেষ্টা করেননি। এখন এই বাসাতে ওর মা নেই। তার জগৎও এই বাসাকে ঘিরে তৈরি হওয়ার কথা নয়। তারপরও ছুটি হলে সে এখানেই আসে। কেন? তাঁর জন্য? তবে কি ছেলেটা তাঁকে ভালোবাসে? তাঁর প্রতি টান অনুভব করে? ছেলেটা এখনো তাঁর সাথে খাওয়ার জন্য অপেক্ষা করে। কেন? তিনি তো ওকে কিছুই দেননি।
তিনি ভাবলেন, আজকে ছেলেটার সাথে কথা বলতে হবে। কাজটা একেবারেই সহজ হবে না। এটা তাঁর স্বভাববিরুদ্ধ। অন্যকে ভালোবাসা না দিতে দিতে তাঁর ভালোবাসার ভাণ্ডার বোধহয় শুকিয়ে গিয়েছে। বেশ কিছুক্ষণ চেষ্টা-চরিত্র করার পর তিনি অবশেষে ছেলেটার নাম ধরে ডাকলেন। ছেলেটা চমকে উঠে মুখ তোলে। অবশ্য চমকানোই স্বাভাবিক। এদিকে তিনি আবার কথা হারিয়ে ফেলেছেন। অনেক কষ্টে তিনি এই কথাটুকু বলতে পারেন, "কেমন আছ তুমি? "
ছেলেটা অবাক হয় এবং অস্বস্তিবোধ করে, কারণ সে হঠাৎ তার বাবার এই প্রশ্ন করার পিছনে কারণ খুঁজে পায় না। তবে তার ভালোও লাগে। সে বলে, "ভালো আছি।" কিন্তু তার পর যে কথাটা সবাই বলে থাকে, "তুমি কেমন আছ? " সেটা সে বলতে পারে না।
বাবা দীর্ঘদিন পর তাঁর ছেলেকে ভালো করে দেখেন। "ভালো আছি " বললেও তাকে দেখে সেরকম মনে হচ্ছে না। বরং তাকে রক্তশূন্য এবং শুকনো দেখাচ্ছে, বড় কোন অসুখে ভুগলে যেমন হয়। কেন? তার কি কিছু হয়েছে? তিনি প্রশ্নটা করতে গিয়েও করতে পারেন না। একসময় ছেলেটা খাওয়া শেষ করে চলে যায়। তারপরও তাঁর প্রশ্নটা করা হয় না। অবশ্য, প্রশ্ন করা হলে সে সঠিক উত্তর না-ও দিতে পারত।
নিজের ঘরে ফিরেও তিনি ওর কথাই ভাবলেন অনেকক্ষণ ধরে। এবং যতই ভাবলেন, তাঁর মনে হলো তিনি ওর উপর খুব বড় অবিচার করেছেন। শুয়ে ওর প্রতি নয়, বরং তাঁর পুরো পরিবারের প্রতি। তাঁর প্রয়াত স্ত্রীর সাথেও তাঁর এমনই দূরত্ব ছিল। সে বেঁচেছিল এবং পরিবারকে ধরে রেখেছিল শুধুমাত্র ছেলেটার জন্য। সারা জীবন সফলতার জন্যই তাই তাঁর সমস্ত সময় ব্যয় করেছেন। তাঁর ধারণা ছিল সফলতাই জীবনের সবকিছু। কিন্তু আজকে তাঁর অন্যরকম মনে হচ্ছে।
তারপর তিনি ভাবলেন, এখনো হয়তো সময় আছে। এখনো হয়তো তিনি অন্তত ছেলেটার কাছে ক্ষমা চেয়ে সবকিছু স্বাভাবিক করতে পারেন। না, তা হয়তো আর হবে না। কিন্তু তিনি অন্তত স্বাভাবিক আচরণ করতে তো পারেন। তাহলে কি কিছুটা হলেও কাজ হবে না?
শেষ পর্যন্ত তিনি ছেলেটার ঘরের দিকে রওনা হলেন। দরজা খোলা। ঘর অন্ধকার, তিনি বুঝতে পারলেন না ছেলেটা ঘরে আছে কি না। অন্ধকার চোখে সয়ে এলে তিনি বুঝতে পারলেন যে ও আসলে ঘুমিয়ে আছে। তিনি দ্বিধান্বিত পায়ে ওর কাছে গেলেন। তারপর আস্তে আস্তে বললেন, "আমাকে ক্ষমা করো, আমি দুঃখিত, আমি এতদিন তোমাকে অনেক কষ্ট দিয়েছি না বুঝে। আমি যদিও জানি এখন আর এসব বলে লাভ নেই, তারপরও বলছি.... " তিনি থেমে গেলেন।








