Chapter 1

লাইফ ইয গুড।
আপস্কেল, পশ ও গেটেড কমিউনিটিতে আমাদের বাড়ীটা, আর বাড়ীর সাথে মানানসই আমাদের অভিজাত লাইফস্টাইল। আমার স্বামী জাভেদ একটি বৃহৎ মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানীর মোটা মাইনের সিনিয়র অফিসার পদে চাকরী করছে।
আমাদের এলাকাটা খুবই এক্সক্লুসিভ, অধিবাসীদের প্রায় সবগুলোই ধণ্যাঢ্য, উচ্চবিত্ত পরিবার। এবং ঢাকার অন্যান্য পশ এলাকাগুলোর মতই স্বাভাবিকভাবে মুসলিম প্রধান এরিয়া। পুরো ব্লকে কেবলমাত্র একটি হিন্দু পরিবার, এবং তারা থাকে ঠিক আমাদের পাশের বাড়ীটাতে।
জাভেদের সাথে আমার বিয়ে হয়েছিলো খুব অল্প বয়সে, উনিশ বছর পুরোতে না পুরোতেই স্বামীর ঘরে উঠিয়ে নেয়া হয় আমাকে। খুব অল্প বয়সেই সংসার শুরু করেছিলাম আমরা। তাই বয়স ত্রিশের কোঠা না ছুঁলেও এক পুত্র ও কন্যাসন্তানের গর্বিত আম্মি আমি, ছেলে ও মেয়ে দু’জনেই অভিজাত প্রাইভেট বোর্ডীং স্কুলে পড়ছে। ফি বছর সেমিস্টার শেষে ওরা বাড়ীতে আসে, আর মাস দুয়েক পরপর আমরা স্বামী-স্ত্রী বাচ্চাদের দেখতে যাই।
ওহ, আমার পরিচয়ই তো দেয়া হলো না - আমার নাম আলভীনা খান। এলাকায় আলভীনা অথবা আলভি নামে সবাই আমায় চেনে।
নতুন প্রতিবেশী হিসাবে হিন্দু পরিবারটি আমাদের পাশের বাড়ীতে ওঠার ক’দিনের মধ্যেই জাভেদ ও আমার সাথে তাদের ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব গড়ে উঠলো। মহেশ আর অর্চনা বৌদী। এ অল্প বয়সেই ঝানু আইনবিদ মহেশদা একটি স্বনামধন্য ল ফার্মের পার্টনার বনে গিয়েছে, স্বভাবতঃই প্রভূত অর্থকড়ির মালিক। অৰ্চনা প্রাথমিক স্কুলের টীচার ছিলো, তবে বাড়ী বদল করার পর থেকে কয়েক মাসের গ্যাপ নিয়েছে, আপাততঃ আমার মত উচ্চশিক্ষিতা গৃহবধূ বনে গেছে আগামী মাস হয়েকের জন্য। আর ওদের একমাত্র পুত্রসন্তান বান্টী একটা নামকরা মাধ্যমিক কলেজে সাইন্সে ফার্স্ট ইয়ারে পড়ে ।
মহেশ ও অর্চনা আমাদের সমবয়েসী – তাই তাদের সাথে হৃদ্যতা গড়ে উঠতে সময় লাগলো না। উভয় পরিবারের মধ্যে প্রায়শঃই টুকিটাকী এটাসেটা খাবারদাবার আদান প্রদান হতে লাগলো। জাভেদ মিষ্টি খেতে পছন্দ করে, স্বামীর জন্য কোনোদিন আমি সেমাই রান্না করলে প্রতিবেশীর বাড়ীতে একবাটী পাঠিয়ে দিতে ভুলি না। আবার অর্চনাও ওর ছেলের জন্য গুড়ের পায়েস রান্না করলে আমাদের সাথে সেটা শেয়ার করতে ভুলে না। প্রতি উইকেণ্ডে মহেশ-অর্চনা হয় আমাদের বাড়ীতে আসে, নয়তো জাভেদ আর আমি তাদের ড্রয়িংরূমে যাই আড্ডা দিতে। মহেশদা তুখোড় বক্তা, আইনজীবীরা সচরাচর যেমন হয় আরকি । তাই আমাদের দুই ভিন্নধর্মে পরিবারের মধ্যে আড্ডা ও ঘণিষ্ঠতা জমে ওঠে দ্রুত।
হিন্দু পরিবারটার সাথে আমাদের সখ্যতা দেখে এলাকার অন্যান্য রক্ষণশীল প্রতিবেশীরা হয়তো একটু চোখ টাটায় । তাতে কিছু যায় আসে না, জাভেদ ও আমি উভয়েই উদারমনা, ধর্ম কিংবা জাতপাতের বিভেদ গৌণ, মনের মিল হলেই আমাদের জন্য যথেষ্ট। পড়শী দু‘য়েকজন আণ্টী বা ভাবীরা আড়ে-ইশারায় অর্চনার পরিবারের সঙ্গে আমার ঘণিষ্ঠতার ব্যাপারে প্রচ্ছন্ন মন্তব্য করেছিলো দু’য়েকবার। তা গায়েই মাখি নি আমি। বরং অন্য পড়শীদের অযাচিত নাক গলানোয় আমরা উল্টো আরো ঘণিষ্ঠভাবে মহেশ ও অর্চনার ফ্যামিলির সাথে মিশতে থাকলাম ।
আমাদের একসাথে দেখতে একটু অড লাগতো কি? সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের মেয়ে আমি, আমার গায়ের রঙ ধবধবে ফর্সা। আমার স্বামী ফর্সা না, তবে অনুজ্বলও না, তামাটে বর্ণের। অর্চনার গায়ের রঙ উজ্জ্বল শ্যামলা, তবে ওর স্বামী মহেশ কৃষ্ণবর্ণের। তাদের সন্তান বান্টীও শ্যামলবর্ণের - বাবা-মায়ের মাঝামাঝি রং পেয়েছে। আমাদের স্বামীরা দু পরিবারের গাত্রবর্ণের পরিসর নিয়ে হাসি ঠাট্টা করতো, বলতো একপ্রান্তে আলভীনা - দুধ ফরসা মুসলমান সুন্দরী, আর অপর প্রান্তে মহেশ - কৃষ্ণবর্ণের টিপিকাল বাঙালী হিন্দু। আর বাদবাকীরা সবাই নাকি সারি ধরে মধ্যিখানে!
স্বীকার করতে দ্বিধা নেই। সমবয়েসী হওয়ায় উভয় পরিবারের মধ্যে হৃদ্যতা তো ছিলোই, মহেশ-অৰ্চনা বৌদীর সাথে সময় কাটাতে আমার ভালোই লাগতো। অন্ততঃ অর্চনার সাথে সকাল-বিকেল মোবাইলে আলাপ কিংবা চা-নাশতার আড্ডাবাজী করে বোরিং গৃহস্থালী জীবনটা কেটে যেতো। কলেজে লম্বা ছুটি, তাই বান্টীও ওর মা-আন্টিদের সাথে আড্ডায় যোগ দিতো।
বান্টীদের কলেজটা শহর থেকে একটু দূরে নতুন ক্যাম্পাসে স্থানান্তরিত হচ্ছে। নতুন ক্যাম্পাসের বিল্ডিংগুলোর নির্মাণ প্রযেক্ট শিডিউল মেনেই সমাপ্ত হয়েছিলো, কিন্তু শেষ মূহূর্তে কয়েকটা ফ্লোরে একাধিক গুরুতর গলতি ধরা পড়ায় তা রিপেয়ার করতে সময় লাগছে। ওদিকে পুরণো ক্যাম্পাস থেকেও পাততাড়ি গুটিয়ে ফেলা হয়েছে, আর দু’য়েকটা বিল্ডিং ইতিমধ্যেই ভাংচুরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে – অতএব ওখানেও আপদকালীন ক্লাস নেবার উপায় নেই। তাই কলেজ কর্তৃপক্ষ মাসকয়েকের ছুটি ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছে।
শ্যামল বর্ণের বান্টী দেখতে হ্যাণ্ডসাম, শুনেছি তুখোড় ক্রিকেট আর ফুটবল খেলে। ইন্টার-স্কুল টুর্ণামেন্টে টীমের ক্যাপ্টেন হিসেবেও নাকি একাধিকবার সে দায়িত্ব পালন করেছে। আমার বড় মেয়ের চেয়ে সে বছর খানেক সিনিয়র হবে। বোর্ডিং স্কুলে পড়া নিজের সন্তানদের অভাব অনুভব করে বান্টীকে আমি বড্ড স্নেহ করতাম। ছেলেটা কি কি খেতে পছন্দ করে, তা জেনে নিয়ে মাঝেমাঝে ওর জন্য স্পেশাল রান্না করে নিয়ে যেতাম অর্চনার সাথে আড্ডা মারতে যাবার সময়। বান্টীর প্রতি আমার স্নেহ, মমতা লক্ষ্য করে অর্চনা প্রায়ই ঠাট্টা করে বলতো যে ভালোই হয়েছে বাড়ী বদল করে এ তল্লাটে এসে - তাদের বান্টী এখন আরো একটা লক্ষী মা’মণি পেয়ে গেলো!
আমার ছেলে ভিডিও গেমের পোকা। বোর্ডীং স্কুলের ছুটি পেলে যখন বাড়ী আসে, পুরোটা সময় ভিডিও গেম খেলে সময় কাটায়। কয়েকটা মাস সন্তানদের কাছে পায়, তাই বাচ্চাদের পেছনে খরচাপাতী করতে আমার স্বামী কার্পণ্য করে না। তাই ছেলের জন্য PS4, এক্সবক্স আর রাজ্যের যত গেম ডিভিডির স্তূপ জমে আছে আমার ঘরে৷
বলার অপেক্ষা রাখে না যে স্বভাবতঃই আমার ছেলের ভিডিও গেমের কালেকশনের প্রতি প্রতিবেশীনীর টীনেজ ছোকরা বান্টীর তীব্র আকর্ষণ ।
অর্চনার সাথে আড্ডা মারার ফাঁকে বান্টীকে অলসভাবে আমাদের মায়েদের মেয়েলী আলাপ শুনতে দেখে কথার ফাঁকে আমিই একবার ওকে দাওয়াত দিয়ে বলেছিলাম আমার ছেলের ঘরে অনেক ভিডিও গেমস- টেমস আছে, বোরড ফীল করলে গেমসগুলো নিয়ে খেলতে পারে সে। আমার প্রস্তাব শুনেই লাফিয়ে উঠেছিলো বান্টী। পারলে আমাকে হাত ধরে টানতে টানতে ঘরে নিয়ে যায় উৎফুল্ল ছেলেটা। বাধ্য হয়ে আড্ডা থামিয়ে বান্টীকে আমার বাড়ীতে এনে ওকে ছেলের ঘরে ঢুকিয়ে দিয়ে গাদাগাদা ডিভিডি আর ইলেকট্রিক তারের জীলেপীতে প্যাঁচানো গেমিং কন্সোল আর জয়স্টিক গুলোর সামনে তাকে বসিয়ে দিয়ে বলেছিলাম, “নাও, এসব আপাততঃ তোমার সম্পত্তি। যেভাবে ইচ্ছা ব্যবহার করো।
গেম ডিস্কগুলোর বহর দেখে নাচতে নাচতে বান্টী খুশি হয়ে বলেছিলো, “উফফফ আলভীনা আণ্টী! তুমি পৃথিবীর গ্রেটেস্ট আণ্টি! আর আজ থেকে সত্যি সত্যিই তুমি আমার আরেকটা মম বলে মেনে নিলাম !
ইশ! পাগল ছেলে একটা! তার কথা শুনে আমার মুখের হাসি আর থামে না।
সেদিনের পর থেকে দিনের বেশিরভাগ সময় বান্টী আমার ঘরেই আসতো। এসেই কোনটা ফেলে কোন গেমটা খেলবে তা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়তো সে। সংসারের কাজকর্ম দেখে নিয়ে দুপুরের দিকে অর্চনাও আসতো আড্ডা দেবার জন্য। আমরা দুই মায়েরা ড্রয়িং রুমে বসে মেয়েলী আড্ডা দিতাম, আর পাশের রূমে জোরালো হুঁশঢাশ শব্দ করে ভিডিও গেম খেলতো বান্টী।
ক’দিন পরে অর্চনার স্কুলে টীচারস ট্রেনিং আরম্ভ হলো। বাসা বদলের অজুহাতে কয়েক মাসের ছুটি নিলেও শিক্ষয়িত্রীর চাকরীটা তো আর অর্চনা ছাড়ে নি। তাই ওকে এ্যাডভান্স ট্রেনিংয়ে যোগদান করতে হলো। সপ্তাহে তিন দিন দুপুর থেকে সন্ধ্যা অবধি কোর্স। তাই আমাদের রোজকারের দুপুরের আড্ডাটা অনিয়মিত হয়ে গেলো। কেবল বান্ডীই রোজ রোজ সকালে নিয়ম করে ভিডিও গেম খেলার নেশায় হাজির হয়ে যেতো আমার ঘরে।
অর্চনা ও ট্রেনিং নিয়ে ব্যস্ত থাকায় আমাদের দুই মা’য়েদের আড্ডাটা আর হয়ে ওঠে না সচরাচর। তাই বোরডম কাটানোর জন্য সংসারের কাজকারবার শেষ করে ইদানীং আমি বান্টীকে সঙ্গ দিই। গেম পাগল টীনেজ ছেলেটার জন্য লেমোনেড আর তার পছন্দের ম্যাগী নুডুলস কিংবা প্যানকেক ইত্যাদি বানিয়ে ছেলের ঘরে নিয়ে যাই। গেমের পোকা বান্টী মেঝেয় কুশন পেতে বসে বসে তন্ময় হয়ে রূপকথার দেশে রাক্ষসখোক্কস বধ করতে ব্যস্ত। এক ঢোক লেমোনেড পান করেই সে হয়তো আবার গেমের ভার্চুয়াল জগৎে হারিয়ে যায়। তাই আমি পাশে বসে তাকে তাগাদা দিই নাশতা খেতে।
ঠিক আমার আপন ভিডিওগেম পাগল ছেলেটার মতই। বান্টী আমার ছেলের চেয়ে বছর তিনেক বড় হবে । তবে বয়সে পরিণত হলে কি হবে? গেমের পোকায় তার মস্তিষ্কও পুরোদস্তুর আক্রান্ত। টীনেজ বয়েসী ছেলেরা বোধকরি এমনই হয়। কি জানি? আমাদের সময় তো ঘরে ঘরে এতো ভিডিও গেমের প্রচলন ছিলো না। বড়জোর আটারী-নিনটেণ্ডো কিংবা পাড়ার দোকানে ভিডিওগেম কনসোল। আমাদের প্রজন্ম বরং খেলার মাঠেই সময় কাটাতো ।
আজকালকার ছেলেপুলেদের জেনারেশন। তবে বান্টী অবশ্য একটু অন্যরকম মনে হয়, স্কুল খোলা থাকলে স্পোর্টিং করে প্রচুর নিশ্চয়ই। স্লিম ও পেশীবহুল কিশোর দেহ তার- দেখেই বোঝা যায়। তার মায়ের মুখে গর্ব শুনেছি ছেলে ফুটবল টীমের ক্যাপ্টেন।










picture can't read
Nice.. Superb....