Chapter 1
পরিচিতিঃ
জাভেদ শেখঃ পাশ্মীরী রাজ্যের রাজধানী ইলাহপূর, থুড়ী রামনগর শহরের অত্যন্ত নামযশওয়ালা, প্রভাবশালী ও ধণ্যাঢ্য ব্যবসায়ী। নিজের মালিকানাধীন একাধিক বৃহৎ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আছে, যেগুলাে থেকে প্রতি মাসে কয়েক কোটি টাকার বেশি সম্মিলিত আয় হয় তার। জাভেদের বয়স মধ্য চল্লিশ পেরিয়েছে।
ফারদীন শেখঃ জাভেদের বেটা ফারদীনের বয়স ২০ এর গােড়ায়, একটি নামী সরকারি কলেজে বিবিএ পড়ছে।
শবনম শেখঃ জাভেদের বিবি শবনম এককথায় ডানা-কাটা-পরী। ত্রিশের দশকে গেলে নাকি নারীদের অন্যরকমের রূপ প্রকাশিত হয়। অতি মাত্রায় সুন্দরী শবনম সম্প্রতি মধ্যত্রিশের কোটা ছাড়িয়ে গেছে।
তবে বয়সটা ত্রিশের মাঝপথ পাড়ি দিয়ে ফেললেও চিরসবুজ শবনম ধরে রেখেছে ওর তারুণ্য আর সৌন্দৰ্য্য। নিজের শরীর ও যৌবনের প্রতি কঠোরভাবে মনােযােগী শবনম। বিয়ের পর অনেকদিন যাবৎ খুব কড়াকড়ি ডায়েট ফলাে করতাে। তবে ত্রিশ পেরােনাের পরে এখন আর তেমনটা হয়ে ওঠে না, অবশ্য সুষম আর অর্গানিক খাবার ছাড়া কিছুই মুখে তােলে না ও। তাই শবনমকে দেখতে কমসেকম ৭/৮ বছর কমই দেখায়। আপন রূপে গরবিনী, এক হ্যাণ্ডসাম সন্তানের মা, ধনবান ব্যবসায়ীর সুন্দরী বিবি শবনম শেখের একটু চাপা অসন্তুষ্টি, একটি শখ অপূর্ণ আছে-বেচারীর পড়ালেখাটা সম্পূর্ণ হয় নি।
খুব অল্প বয়সে বিয়ে হয়ে গিয়েছিলাে শবনমের। এক দেখাতেই শবনমকে বিবি বানাতে রাজী হয়ে গিয়েছিলাে জাভেদ…

***
সে প্রায় দুই দশক আগের কথা। ব্যবসাকর্মে খুব দ্রুত উন্নতি করছিলাে জাভেদ। তবে বয়স তাে আর থেমে থাকে না। বয়স ত্রিশের কোঠির দিকে আগাচ্ছিলাে ব্যাচেলর ব্যবসায়ীর। এ বয়সেই কয়েক কোটি টাকার সম্পত্তি বানিয়ে নিয়েছিলাে, আর যে কাজেই হাত দিচ্ছিলাে তাতে উন্নতি মিলছিলাে। তবে পরিবার থেকে বিয়ে করার তাগাদা বাড়ছিলাে। সফল ব্যবসায়ী জাভেদ একটু রয়েসয়ে মেয়ে দেখছিলাে। কাড়িকাড়ি টাকা কামাচ্ছে, তাই শহরের সেরা সুন্দরী মেয়েটাকে বিবি হিসেবে চাই তার।
ইতিমধ্যেই বিগত তিন বছরে প্রায় অর্ধশতাধিক তরুণীর হৃদয় ভেঙ্গে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে সে। ঘটক আর খালা-মামীরা গলদঘর্ম হয়ে পড়ছিলেন এই দাপুটে কিন্তু ডিমাণ্ডেবল ব্যাচেলরের জন্য মেয়ে দেখতে।
একদিন কিছু মালামাল সাপ্লাই দিতে এক মার্কেটে গিয়েছিলাে জাভেদ। সেখানে এক কাপড়ের দোকানে মায়ের সাথে কেনাকাটা করতে আসা এক অনিন্দ্যসুন্দরী তরুণীকে এক নজর দেখেই মনস্থির করে নেয় জাভেদ-এই হুরপরীটাকেই তার চাই জীবন সঙ্গীনি হিসাবে। অষ্টাদশী শবনম খানমের গতর থেকে তখনও টীনেজ লাবণ্য ছেড়ে যায় নি। কলেজলাইফ খতম করে ইউনিভার্সিটিতে ভর্তী হবার জন্য অপেক্ষায় ছিলাে। পূর্বপরিচিত দোকানীর কাছ থেকে সুন্দরী মেয়েটির পরিবার, ঠিকানা ইত্যাদি বৃত্তান্ত জোগাড় করে নেয় জাভেদ। দু’দিন পরেই এক ঘটকের মাধ্যমে প্রস্তাব পাঠায় জাভেদের পরিবার।
ক্রমাগত উন্নতি করতে থাকা সফল ও উঠতি ব্যবসায়ী জাভেদকে দেখে এক কথায় রাজী হয়ে যায়। শবনমের পরিবার। শবনম বেচারী মােটেই রাজী ছিলাে না এ বয়সেই বিয়ের পিঁড়িতে বসবার জন্য, জীবনটাকে দেখার কতই না বাকী ছিলাে ওর। তবে বেচারীর দাদী কিছুদিন ধরে দূরারােগ্য রােগে ভুগছিলেন, জীবনের শেষ লগনে উপস্থিত হবার আগে প্রিয় নাতনীকে একটি ভালাে ছেলের হাতে তুলে দেবার জন্য তিনিই খুব জোর করলেন। শবনমের স্বপ্ন আধুরা রয়ে গেলাে, ভার্সিটীর ভর্তী পরীক্ষার নােটিশ বের হবার আগেই ওর বিয়ের কার্ড ছাপা হয়ে গেলাে। এক দশক ব্যবধানের বেশি বয়সী এক যুবকের ঘরণী হয়ে টীনেজের গণ্ডি থেকে বের না হতে পারা শবনম খানমের বংশপদবী খান থেকে শেখ-এ বদলে গেলাে।
যাকগে, শত অপ্রস্তুততা সত্বের সাহস করে ভার্সিটির ভর্তী পরীক্ষাটা দিয়ে দিলাে, এবং টিকেও গেলাে। আপন মেধায় বিবিএ কোর্সে ভর্তী হয়ে গেলাে শবনম। তবে ভার্সিটীর মুক্ত জীবনের স্বাদ নেবার আগেই মাতৃত্বের শৃঙ্খলে আটকা পড়লাে নববধূ শবনম শেখ।
চতুর ব্যবসায়ী জাভেদ ছক কষে নিকাহের তিন মাসের মাথায়ই সুন্দরী ও অল্পবয়সী বিবিকে গর্ভবতী করে দিলাে। সংসারের দায়িত্ব সামলে ইউনিভার্সিটির পড়ালেখা চালিয়ে নিচ্ছিলাে শবনম। কিন্তু হঠাৎ প্রেগন্যান্ট হয়ে পড়ায় তাতে সমস্যা হয়ে গেলাে। সন্তানের দেখভাল আর সংসার সামলাতে শবনম এতই ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাে যে ওর শিক্ষাজীবন চালিয়ে যাওয়া কঠিনই হয়ে পড়েছিলাে। তবুও অদম্য শবনম উৎসাহে কলেজে ক্লাস চালিয়ে যাচ্ছিলাে।
শত ব্যস্ততার মধ্যেও টেনেটুনে বছর তিনেক পড়াশােনা চালিয়ে গেছিলাে শবনম। তবে জাভেদ ব্যবসার কাজে দুবাইতে স্থানান্তরিত হলে পড়ালেখার যবনিকা টানা হয়ে গেলাে। কলেজ থেকে ড্রপআউট হয়ে স্বামী সন্তানকে নিয়ে বিদেশে চলে গেলাে বেচারী। পড়ালেখার সুতােটা সেই যে ছিড়ে গেলাে, বিগত দুই দশকে তা আর জোড়া লাগে নি।
শবনমের জীবনে কোনাে কিছুরই কমতি নেই। অঢেল সম্পত্তি, একাধিক দামী গাড়ী হকায়, চাকর-বাকর-ড্রাইভার-খানসামাদের দল ওর সেবায় নিয়ােজিত। বছরে কয়েকবারই বিদেশ ট্যুর। অজস্র দামী পােশাক, গহনা, জুতাে, প্রসাধনী ওর শােকেস আর আলমারী ভর্তী। যেকোনও পার্টী বা দাওয়াতে গেলে অতিথিরা এখনাে ওর রূপে মুগ্ধ হয়ে শবনমকে ঘুরে ঘুরে দেখে। তবুও পড়ালেখার আধুরা স্বপ্নটা এখনাে শবনমকে কুরে কুরে খায়। যেকোনাে অনুষ্ঠানে সকল বান্ধবী ও ভাবীদের ঈর্ষার পাত্রী শবনম, ওর অনিন্দ্য রূপের আগুন থেকে নিজেদের স্বামীদের আগলে রাখতে সকলেই ব্যস্ত। তাই শবনমকে নিয়ে পরচর্চা নেহাত কম হয় না। আর কোনও দোষ ধরতে না পেরে ওর শিক্ষাজীবনের অসমাপ্তির বিষয়টাকেই খুঁচিয়ে দগদগে করে রাখতে পছন্দ করে কুটনামী করা রমণীরা।
***
গতকাল রাতের একটা ঘরােয়া অনুষ্ঠানেও তেমনটিই হয়েছিলাে। শবনমকে নিয়ে উপস্থিত রমণীদের মধ্যে সমালােচনার আসর বসেছিলাে। এক বন্ধুর মাধ্যমে সে আলােচনার বিষয়বস্তু বেচারা জাভেদ জেনে যায়।
সকালে নাশতার টেবিলে চিন্তিত মুখে বসেছিলাে জাভেদ।
আড়মােড়া ভাঙতে ভাঙতে ফারদীন ব্রেকফাস্ট করতে এসে দেখে ওর আব্ব গােমড়া মুখে বসে চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছে। একটা ট্রে-তে টোস্টেড পাউরুটির স্লাইস হাতে নিয়ে তার মাম্মি শবনমও ডাইনিং হলে এসে দেখে জাভেদ গম্ভীর মুখে কি যেন চিন্তা করছে। শবনম-কি হয়েছে গাে? এ্যাতাে টেনশন করছেন কেন আপনি?
জাভেদ-শবনম, আমার কারণে তােমার সব স্বপ্ন আধুরা রয়ে গেছে, তাই না?
শবনম (অবাক হয়ে)-ওমা, কোন স্বপ্নটা আধুরা রয়ে গেছে শুনি?
জাভেদ-আমার কারণে তােমার পড়াশােনা ছুটে গেলাে ..
শবনম (হেসে সহজ করে নেয়)-আহা! আপনার কারণে নয়। আমাদের লক্ষী বেটা ফারদীন দুনিয়ায় এসেছিলাে তাে, তাই ওর আগমনে আমরা এতােই খুশি ছিলাম যে বইখাতার কথা ভুলেই গেছিলাম। কিন্তু আপনি এসব পুরণাে ব্যাপার নিয়ে টেনশন করছেন কেনো?
জাভেদ-শবনম, আমি চাই তুমি তােমার পড়ালেখা সম্পূর্ণ করাে।
এ কথা শুনে মা ও ছেলে উভয়েই চমকে যায়।
ফারদীন-ইয়াল্লা ড্যাড, এই বয়সে মাম্মী কলেজে যাবে ?!
জাভেদ-কেন? পড়ালেখার আবার বয়স আছে নাকি?
শবনম-ইয়া খুদা! ফারদীন ঠিকই বলছে ... এই বুড়ি বয়সে আমি কলেজে পড়বাে ?!
জাভেদ-কার বুড়ি বয়স ?! নিজেকে দেখাে শবনম, যাস্ট একটা জীন্স আর টপস পড়ে ফেললে
তােমাকে একদম তেইশ-চব্বিশ সালের কচি চুড়ি বলে মনে হবে!
শবনম-কিন্তু, জান ...
জাভেদ-কোনও কিন্তু টিন্তু চলবে না। পড়াশােনা নিয়ে তােমারও অনেক স্বপ্ন ছিলাে শবনম, এবার সে স্বপ্ন তুমি পুরণ করাে।
শবনম-আচ্ছা সে ঠিক আছে। কিন্তু আমাকে এ্যাডমিশন কে দেবে?
জাভেদ-আরে জান, সে ব্যবস্থা আমি করে দিচ্ছি। তােমার এ্যাডমিশন আমি ফারদীনের কলেজেই করিয়ে দিচ্ছি।
ফারদীন (দুধের গ্লাসে বিষম খেয়ে কাশতে কাশতে)-ওহ শিট! ড্যাড! আমার কলেজে?!?!
শবনম (চমকে গিয়ে)-বেটা, প্লীয় মাইণ্ড ইওর ল্যাঙ্গুয়েজ ...
জাভেদ-কেন? তাের কলেজে আম্মি এ্যাডমিট হলে তাের প্রবলেম কিসের?
ফারদীন-না, আমার কোনও প্রবলেম নেই। তবে ড্যাড, মাম্মীকে হােস্টেলে দিয়ে দাও, যাতে কেউ যেন জানতে না পারে ও আমার আম্মি ... মাম্মী আর আমি একই কলেজে পড়ি জানতে পারলে আমার ইজ্জতের ফালুদা বানিয়ে ফেলবে আমার ক্লাসমেটরা ...
জাভেদ আপত্তি জানাতে যাচ্ছিলাে। তবে শবনম ছেলের পক্ষ নিয়ে স্বামীকে থামিয়ে দিলাে।
শবনম-ফারদীন ঠিকই বলেছে, জান। আমাদের আলাদা দূরত্ব মেইনটেন করাই ভালাে হবে, নইলে কলেজে দু’জনেরই সমস্যা হবে ... কেউ জানবার দরকারই নেই যে আমরা মা-ছেলে।
জাভেদ (একটু চিন্তা করে নিয়ে)-আচ্ছা, ঠিক আছে।
পরদিন মােটা অংকের ডােনেশন দিয়ে শবনমের এ্যাডমিশন করিয়ে দিলাে ছেলের কলেজে।
হপ্তাখানেকের ছুটি চলছিলাে, তাই কলেজটা ছাত্রছাত্রী শূন্য। তবে অফিস খােলাই ছিলাে। সেশনের মাঝপথে নতুন ছাত্রী ভর্তী করতে নিমরাজী ছিলাে কলেজের প্রিন্সিপাল। তবে জাভেদের ডােনেশনের চেকটা সে আপত্তি কাটিয়ে দিতে তাৎক্ষণিক কাজে দিলাে। শবনমের জন্য হােস্টেলের রূমও ব্যবস্থা হয়ে গেলাে। লেডীজ হােস্টেলে রূমের সংকট লেগেই থাকে কারণ সেখানে সীটের সংখ্যা কম। তবে প্রিন্সিপালবাবু মােটা অংকের চেকটায় হাত বুলােতে বুলােতে সমাধান করে দিলেন, একটি মেয়েকে অন্যত্র স্থানান্তরিত করিয়ে সীট খালি করিয়ে নিলেন জাভেদের বিবির জন্য। আগামী সপ্তাহ থেকেই জয়েন করতে পারবে শবনম, সমস্ত ব্যবস্থা করে নিয়ে প্রিন্সিপাল বাবু জানালেন।
***








