Chapter 1
তখন আমি মাত্র অনার্স কমপ্লিট করেছি। চাকরির বাজার খা খা করছে। বন্ধুদের অনেকেই বেকার হয়ে বসে আছে। আমি খুব ছোট একটা কাজ করছি নাইট শিফটে। এয়ারপোর্ট এরিয়াতে ট্যাক্সি চালাই তখন আমি। রোজ বেশ ভালো ইনকাম, রাত আট টা থেকে ভোর ছয়টার শিডিউল বানিয়ে কাজ করতে খারাপ লাগছিলো না।
এলিসার সাথে আমার দেখা ৯ই সেপ্টেম্বর ১৯৯৯, রাত একটা বেজে হয়তো দশ পনেরো। সাধারণ একজন প্যাসেঞ্জার হিসেবে ট্যাক্সিতে উঠেছিলো সে। তাকে ড্রপ করতে হবে তার ভাষ্যমতে, ‘ Best Hotel in Dhaka ’। স্বভাবতই বিদেশীরা বেস্ট বলতে যা বুঝাতো তখন, সেটা বুঝতাম। নিয়ে গেলাম সোনারগাও হোটেল।
সে আমাকে এর চেয়ে কম খরচের হোটেল খুজে দিতে বলে। আমি পড়ি বিপাকে। তখন ঢাকায় বিদেশীদের থাকার মত হোটেল কয়টা ছিলো জানি না, তবে সোনারগাও ছাড়া আর কোনও ভালো হোটেলের খোজ আমার জানা ছিলো না। আমি তাকে কাওরান বাজার নেমে যেতে বললে সে আমার কাছে সাহায্য চেয়ে বসে। রেশমী চুলের অধিকারী একটা মেয়েকে না বলতে পারি নি। সারারাত খুজে খুজে একটা হোটেল খুজে বের করে দিতে আমাদের লাগলো তিন ঘন্টা।
সেই তিন ঘন্টায় আমরা অনেক কথা বললাম। নাম, পরিচয় বিনিময় হলো। জানলাম, ওর ট্রাভেলিং এর শখ থেকেই বাংলাদেশে আসা। এত দেশ থাকতে বাংলাদেশ কেন, কি দেখবেন, এই কথার এদিক সেদিক থেকে এলিসা আমাকে তার ট্যুর গাইড হওয়ার প্রস্তাব দিলো। আবারও, আমি না করতে পারি নি।
আমাদের দ্বিতীয় দেখা হয় ১১ই সেপ্টেম্বর। তখন এই সময়ের মত ফোনের চল ছিল না। আমাকে বলা হয়েছিলো ভোর সাতটায়। আমি তার হোটেলের সামনে ভোর ছয়টার সময় গিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম। আমার মনে আছে, ও একটা হলুদ রঙ এর কুর্তা পড়েছিলো সেদিন। ১১ই সেপ্টেম্বর, আমার জীবনের প্রথম দিন, মনে হলো এই মেয়েটাকে না পেলে আমি পাগল হয়ে যাবো। তখন মেয়েটাকে ভালো লেগেছে বা ক্রাশ খেয়েছি টাইপ কথার দিন ছিলো না। তখন ছেলেরা সত্যি সত্যি কাউকে না পেলে পাগল হয়ে যেতো।
১৮ই সেপ্টেম্বর, রাত সাড়ে এগারোটায় তাকে এয়ারপোর্টে নামিয়ে দিয়ে আসলাম। স্বভাবতই এই মেয়ের আর আসবে না এই দেশে। আমার মন চরমভাবে খারাপ। এলিসা ব্যাপারটা বুঝেছিলো। আমাকে অবাক করে দিয়ে বললো, ‘ I’ll come back in 6 month, a year top. When I come back, I want you to pick me up. You have an Email, right? ’
ইমেইল জিনিসটা আমার ছিলো না। অথচ আমি তাকে বলেছিলাম, আমার ইমেইল আছে। বারোটার ফ্লাইট, আমি তাকে ওখানে রেখেই আর কিছু না বলে দৌড় দিলাম। একটা ইমেইল বানানো দরকার। ইমেইল বানানোর জন্য কম্পিউটার দরকার। এতো রাতে এরকম কোনও দোকান খোলা নেই জানার পরেও ওই আধা ঘন্টায় আমি উত্তরা ট্যাক্সি নিয়ে ঘুরলাম। এয়ারপোর্ট এসে এয়ারপোর্টের লোকগুলোকে বললাম, দুই মিনিট কম্পিউটার ব্যবহার করবো। অনুমতি পেলাম না। আবার ট্যাক্সিতে উঠলাম, আবার নেমে পড়লাম। ট্যাক্সিতে উঠে কি হবে? তার চেয়ে বড় কথা, আমি কি পাগল হয়ে যাচ্ছি? আমি জানতাম না ইমেইল কিভাবে বানাতে হয়, কম্পিউটারে কি কি করলে ইমেইল বানানো যায়। অথচ আমি ছুটছিলাম।
বারোটার ফ্লাইট ছাড়লো দেড়টায়। এই দেড় ঘন্টা আমি এলিসার পাশেই বসে ছিলাম। দেড় ঘন্টা মনে হচ্ছিলো চোখের পলকে শেষ হয়ে যাচ্ছে। ওর দিকে তাকিয়ে এক পলক ফেলেছি, দশ মিনিট পার হয়ে গেছে। আমার প্রচন্ড রাগ আর কষ্টে অদ্ভুত ভাবে পেট খারাপের মত হয়ে গেলো। এইরকম আর কারও সাথে হয়? প্রচন্ড রাগ আর কষ্টে পেট খারাপ হওয়া? আমার হয়েছিলো।
২০০০ সালের ৪ অক্টোবর। ও আবার বাংলাদেশে আসে। আমাকে ও খুজে বের করে। আমার ভার্সিটি থেকে খবর নিয়ে আমাকে খুজে বের করতে ওর তিন দিন লেগেছিলো। সেই দ্বিতীয়বার তৃতীয়, চতুর্থ থেকে দশ বারোবার এলিসার সাথে আমার দেখা হয়েছে। যতবার এসেছে, আমাকেই রিসিভ করতে হতো ওকে। এই দশ বারোবারের দেখায় আমাদের ভিতরের বরফ গলে ততদিনে পানি হয়ে গেছে। আমাকে জড়িয়ে ধরা, আমার গালে টুস করে চুমু খাওয়ার মত কাজগুলো এই মেয়ে অবলীলায় করে ফেলতো। আর আমি ওর চোখের দিকে দুই সেকেন্ড তাকিয়ে থাকতে পারতাম না। আমার বরফ তখনও গলে নি।
দুই বছর ও বাংলাদেশে এসেছে গুণে গুণে সতেরো বার। সতেরো বারের বেলায় ও আমাকে জানালো, ওর ট্রাভেলিং এর দিন শেষ। আর কয়েকটা দেশে গিয়ে, ওর ট্রাভেলিং শেষ হবে। পৃথিবী ঘুরে দেখা হয়েছে ওর। আর না।
১৮ই সেপ্টেম্বরের মত আবার আমার পেট খারাপ হলো। ওর ফ্লাইট ছিলো সেদিন রাত এগারোটায়। আমি খুব করে চাইছিলাম, ও আমার কাছে আবার ইমেইল চাইবে। আমার ইয়াহু তে তখন একটা ইমেইল একাউন্ট ছিল।
ও আমার কাছে ইমেইল চাইতে গিয়ে হু হু করে কান্না করতে থাকলো। একটা রেশমী চুলের পরীর মত মেয়ে, আমার মত সাড়ে পাঁচ ফিটের গোলাকার আটার বস্তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে কান্না করছে। আশেপাশের মানুষগুলো এই দৃশ্য নিতে পারছিলো না। আর আমি ওর কান্না নিতে পারছিলাম না। কত কিছু বলার ছিলো, কত কিছু বলতে পারতাম সেইদিন। অথচ আমার সেই মুহুর্তের কথা ছিলো, ‘ I have a yahoo Email now.... ’
ইমেইলে ও আমাকে অদ্ভুত সব ছবি পাঠাতো। কয়েকটা কুকুরের বাচ্চা ওর উপরে উঠে আছে, আর ও জিভ দিয়ে ভেংচি কেটে ছবি তুলেছে। আমি রিপ্লে দিতাম, এত কুকুরের বাচ্চা ও পেলো কোথায়? বলে রাখি, সাথে সাথে ইমেইলের রিপ্লে আমি দিতে পারতাম না। ওর রাতের পাঠানো ছবির রিপ্লে আমি দিনে দিতাম। আমার দিনের ম্যাসেজের রিপ্লে ও রাতে দিতো। সেই রিপ্লে আমি সকালে দেখতে পারতাম।
২০০৫ সালের আগস্টের একটা দিন, তারিখ মনে নেই। ও ম্যাসেজ পাঠালো, ‘ I miss you! ’ সকালে আমার আবার পেট খারাপ হয়ে গেলো। আমি অফিসে যেতে পারলাম না। (ততদিনে আমার একটা চাকরিও হয়ে গেছে) আমার দুপুরে ক্ষুধা পেলো না। রাতে ঘুম আসলো না। ওকে রিপ্লে দিতে ভুলে গেলাম। আমি আবার পাগল হয়ে গেলাম।
দুই দিন পর ওকে ম্যাসেজের রিপ্লে দিতে গিয়ে দেখি ওর আরেকটা ম্যাসেজ। বিশাল একটা ম্যাসেজ ছিলো সেটা...
’ Riaz, I don’t know what you feel about me, but I think I have feelings for you. It’s not like I’m missing you like a friend. I’m missing you cause I’m missing you. I don’t have a lot of friends or family to remember, but I have some people like you, who took care of me like no other. But out of all those people, I like you the most. Let’s put it that way, You’re the only guy I’ve met during my travel that I didn’t slept with. I know this isn’t allowed to your community or culture, and that’s totally fine. I’ve met great guys. And everyone were supportive. But I didn’t visit them like I visited you. I can’t forget the night you ran like a mad man just to make an Email. No one has ever done anything like this to me. I remember every time when I held you, you suddenly became a paralyzed person. Every time when I kissed you on your cheek, you blushed like a high school nerd!
The reason that I’m telling everybody that I’ve visited the whole world, there’s nothing to see, is a lie. I just can’t afford it anymore. I’ve always tried to minimize my expenses but eventually I failed. I know this is a lot for you, but I want you to visit me, once. I’ll sponsor you some money if you want to. But I want you to visit me. I’ll wait for your reply. Please don’t make me wait like a thousand years Riaz! ’
আমি তিনবার ম্যাসেজ টা পড়বার পর দুধের বাচ্চার মত কান্না করতে থাকলাম। তারপর ওকে ফিরতি ম্যাসেজ পাঠালাম, টিকিটের দাম কত জানতে চাইলাম। সবচেয়ে কম দামী টিকিটের দাম কত, কোন পাশের সিট টা ভালো, জানালার ধারের সিট টা নাকি তার পাশের সিট, প্লেনের খাবার কিনে খেলে লাভ না খাবার সাথে করে নিয়ে গেলে লাভ, এই কথাগুলো চলতে লাগলো আমাদের মধ্যে।
তখন আমার বেতন ছিলো সাত হাজার। সারাদিন কাজ করে রাতের খাবার খেয়ে আমি আবার ট্যাক্সি চালানো শুরু করলাম। ট্যাক্সিতে ঘুমাতাম। সকালে হাত মুখ ধুয়ে কিছু মুখে দিয়ে আবার অফিস। মাসের টাকা জমাতে শুরু করলাম, একশো, দুইশো, এক হাজার টাকা হতে হতে অনেক টাকা জমতে থাকলো।
আজ ২০১৭ সালের শেষ শুক্রবার। ২৯শে ডিসেম্বর। টিকিটের টাকা জমেছে। কিন্তু সমস্যায় পড়ে গিয়েছি আমি। এলিসার কবর নাকি আমেরিকাতেই দেয়া হয় নি। জানি না কানাডার কোন কোণায় ওর কবরটা আছে, ম্যাপ চেক করে দেখেছি কানাডা এক বিশাল দেশ। এত বড় দেশে একটা এলিসা নামের রেশমী চুলের মেয়ের কবর কিভাবে খুজে বের করবো, আমি নিজেও জানি না। এখন আমার হাতে একটা এন্ড্রয়েড সেট, ইচ্ছে হচ্ছে, এলিসার ফেসবুক একাউন্টে চলে যাচ্ছি। লাস ভেগাসের সেই শুট আউটের আগেও ও লাইভে এসেছিলো। হাসি হাসি মুখে আনন্দেই ছিলো মেয়েটা। হুট করে সব বদলে গেলো। বদলে গেলো আমার ১৫ বছরের সব পরিকল্পনা। শুনেছি আমেরিকা থেকে ট্রেনে করে কানাডা যাওয়া যায়। এতো না ভেবে কানাডার টিকিট কাটলেই তো হয়! আমার পেট মোচড়াচ্ছে। প্রচন্ড রাগ আর কষ্ট। কষ্টের কারণ টা জানি, রাগের কারণ টা কি? পেটের সাথে সাথে শরীর গোলাচ্ছে। বমি করে দিবো যেকোনও সময়। পাগলের মত এয়ারপোর্টে ঝাকুনি দিয়ে পড়ে গেলাম। দুধের বাচ্চার মত কান্না দেখে অনেকেই আমায় পাগল ভাবছে, ভাবুক। আমি কাঁদছি আর ভাবছি এই প্রচন্ড বমি ভাব নিয়ে আমি প্লেনে উঠবো কিভাবে? প্লেনে আমাকে উঠতেই হবে। কিন্তু কিভাবে? আমি আশেপাশের লোকদের এই প্রশ্ন করতে করতে কান্না করতে লাগলাম, আমার পেটের ব্যথা কমছে না।








